০৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১৫:৩১

শিরোনাম
নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধির সাক্ষাৎ ডিসেম্বরে চালু হতে পারে শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল : বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানি হয়েছে ৯৩ লাখের বেশি পশু ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরল ২৮১ প্রাণ :রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জুলাই থেকে চালু হচ্ছে হেলথ কার্ড, মিলবে স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরলেন ড. খলিলুর রহমান ৭ জুন থেকে মেট্রোরেলের শেষ ট্রেনে বাড়লো ২০ মিনিট
শিরোনাম
নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধির সাক্ষাৎ ডিসেম্বরে চালু হতে পারে শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল : বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানি হয়েছে ৯৩ লাখের বেশি পশু ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরল ২৮১ প্রাণ :রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জুলাই থেকে চালু হচ্ছে হেলথ কার্ড, মিলবে স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরলেন ড. খলিলুর রহমান ৭ জুন থেকে মেট্রোরেলের শেষ ট্রেনে বাড়লো ২০ মিনিট

ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম: অদৃশ্য ফাটলে ভাঙছে আস্থার প্রাসাদ

ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম: অদৃশ্য ফাটলে ভাঙছে আস্থার প্রাসাদ

মো: রিশাদ আহমেদ

প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল, ২০২৬, ০০:৩২

শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক প্রাসাদ—দেখতে চকচকে, কাঁচে মোড়া, আলো ঝলমলে। বাইরে থেকে মনে হয়, এ যেন নিরাপত্তার আরেক নাম, ভরসার এক অটুট প্রতীক। মানুষ তার সঞ্চয়, তার ভবিষ্যৎ, তার স্বপ্নগুলো তুলে দেয় এই প্রাসাদের হাতে। কিন্তু ভিতরে যদি চুপিসারে জন্ম নেয় ফাটল? যদি দেয়ালের ভেতরেই পচন ধরে, আর একদিন হঠাৎ ভেঙে পড়ে সেই প্রাসাদ? ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চিত্র যেন ঠিক এমনই এক অদৃশ্য ফাটলের গল্প। যেখানে আস্থার ভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ টেরও পাচ্ছে না, তাদের সঞ্চয়ের ভিত কতটা নড়বড়ে হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি—সব ক্ষেত্রেই এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। মানুষের ছোট ছোট সঞ্চয় একত্র হয়ে গড়ে তোলে বড় বিনিয়োগের ভিত্তি। কিন্তু গত এক দশকে বারবার উঠে এসেছে নানা অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার, এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার অভিযোগ। সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ী হয়ে পড়েছে, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে তা আর ফেরত দেয়নি। ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট তৈরি হচ্ছে, নতুন করে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, আর সাধারণ আমানতকারীরা ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে।

এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই চিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বছর বছর বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন সময় নানা ছাড়, পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হলেও বাস্তবে ঋণ আদায়ের হার সন্তোষজনক নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বড় ঋণগ্রহীতারা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে সহজেই দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ছোট ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ অনেক বেশি, তাদের জন্য নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। এতে তৈরি হচ্ছে বৈষম্য এবং ক্ষোভ। একই সঙ্গে কিছু ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—কাগজে-কলমে লাভ দেখানো হলেও বাস্তবে তাদের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল। এতে বিনিয়োগকারী এবং আমানতকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

এই অনিয়মের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ, যা গভীরভাবে বিশ্লেষণ না করলে সমস্যার মূল ধরা যাবে না। প্রথমত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অযোগ্য বা অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে সম্পর্ক বা প্রভাব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাদারিত্বের অভাব দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত, তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সময়মতো এবং কার্যকরভাবে নজরদারি করতে ব্যর্থ হলে অনিয়মের সুযোগ বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। যখন ব্যাংকিং সিদ্ধান্তগুলো অর্থনৈতিক যুক্তির বদলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়, তখন ঝুঁকি বাড়ে। চতুর্থত, ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের অভাব। অনেক সময় প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই না করেই বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়, যা পরে অনাদায়ী হয়ে পড়ে। পঞ্চমত, জবাবদিহিতার অভাব। কোনো অনিয়ম ধরা পড়লেও অনেক সময় তার সুষ্ঠু তদন্ত বা শাস্তির ব্যবস্থা হয় না, ফলে একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সবচেয়ে আগে প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এমনভাবে ক্ষমতায়ন করতে হবে, যাতে তারা কোনো প্রভাব ছাড়াই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। ঋণ প্রদানের আগে কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, যাতে অযোগ্য বা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতারা সহজে ঋণ না পায়। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বড় ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অন্যরা সতর্ক হয়। এছাড়া ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন আরও স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য জানতে পারে এবং তাদের আস্থা ফিরে আসে।

সবশেষে বলা যায়, ব্যাংকিং খাতের এই অনিয়ম কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক আস্থারও সংকট। যখন মানুষ তার কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখে, তখন সে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, পুরো ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস রাখে। সেই বিশ্বাস যদি ভেঙে যায়, তাহলে তার প্রভাব পড়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে। তাই এই সমস্যাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এখনই সময় দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার, অন্যথায় সেই চকচকে প্রাসাদের ভেতরের ফাটল একদিন প্রকাশ্যে এসে পড়বে, আর তখন ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

লেখক,
মো: রিশাদ আহমেদ
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 
ইমেইল : [email protected]

আরও পড়ুন