২৯ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০১:১২

শিরোনাম
জ্বালানি ও বিনিয়োগে সম্পর্ক গভীর করতে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা ১২ আগস্ট দেখা যাবে বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ শাহজালাল বিমানবন্দরে ৯২ লাখ টাকার স্বর্ণ উদ্ধার, আটক ২ প্রথমবার জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১ আগস্ট থেকে সব গণপরিবহনে জিপিএস বাধ্যতামূলক ১৫৭ বছরের পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন হচ্ছে কক্সবাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রথম পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গ্যাস সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে মালয়েশিয়া: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী
শিরোনাম
জ্বালানি ও বিনিয়োগে সম্পর্ক গভীর করতে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা ১২ আগস্ট দেখা যাবে বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ শাহজালাল বিমানবন্দরে ৯২ লাখ টাকার স্বর্ণ উদ্ধার, আটক ২ প্রথমবার জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১ আগস্ট থেকে সব গণপরিবহনে জিপিএস বাধ্যতামূলক ১৫৭ বছরের পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন হচ্ছে কক্সবাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রথম পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গ্যাস সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে মালয়েশিয়া: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

বিশ্বের মানচিত্রে রক্তাক্ত ইরান

বিশ্বের মানচিত্রে রক্তাক্ত ইরান

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

প্রকাশিত: ০২ মার্চ, ২০২৬, ০২:০৯

যখন দিগন্তজোড়া আকাশে যুদ্ধবিমান ছুটে যায়, তখন শুধু বোমা পড়ে না, পড়ে একটি জাতির আত্মমর্যাদা, পড়ে ইতিহাসের গায়ে নতুন ক্ষত। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে ইরান যেন আজ সেই একা দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষ, যাকে ঘিরে ঝড় উঠেছে। কিন্তু ঝড় যতই প্রবল হোক, শেকড় যদি গভীরে থাকে, গাছ উপড়ে ফেলা সহজ নয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক আগ্রাসন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনির হত্যাকাণ্ড কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত। প্রশ্ন এখন শুধু সামরিক শক্তির নয়, প্রশ্ন নৈতিকতার, প্রশ্ন মুসলিম বিশ্বের ভূমিকার।

‎১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান পশ্চিমা প্রভাবের বিপরীতে একটি স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন ইস্যু, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, পারমাণবিক কর্মসূচি সব মিলিয়ে ইরানকে দীর্ঘদিন ধরেই চাপে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।সাম্প্রতিক যৌথ হামলা ছিল সেই দীর্ঘ উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ। কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে টার্গেট করা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গভীর বিতর্ক তৈরি করেছে। রাষ্ট্রপ্রধানকে সরিয়ে দিয়ে শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা এটি কোনো স্বাভাবিক সামরিক পদক্ষেপ নয় বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে সরাসরি হস্তক্ষেপ। খামেনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও বিপ্লবী চেতনার প্রতীক। তাঁর হত্যার মাধ্যমে একটি শূন্যতা তৈরি করা হয়েছে যার অভিঘাত শুধু তেহরানে নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

‎আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যখন কোনো আঞ্চলিক শক্তিকে দুর্বল করতে চায়, তখন তারা প্রথমে অর্থনৈতিক অবরোধ, পরে কূটনৈতিক চাপ এবং সর্বশেষে সামরিক পদক্ষেপ নেয়। ইরানের ক্ষেত্রেও একই প্যাটার্ন দেখা গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা এবং তেল রপ্তানিতে বাধা আরোপ করা হয়েছে। তারপরও ইরান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়েছে ড্রোন প্রযুক্তি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই হামলার পর ইরান একক সামর্থ্যে পাল্টা জবাব দিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে অর্থনৈতিক অবরোধ কোনো জাতির প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে পারে না। সামরিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরান তার প্রতিরক্ষা অবকাঠামোকে এমনভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে যাতে নেতৃত্ব হারালেও প্রতিরোধ চালু থাকে। এখানেই ইরানের শক্তি ব্যক্তিনির্ভর নয়, কাঠামোনির্ভর প্রতিরোধ।

‎ইরানের বিরুদ্ধে চালানো এই আগ্রাসনের কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার। ইরান দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন প্রশ্নে সরব এবং ইসরায়েলের নীতির কড়া সমালোচক। ফলে ইরানকে দুর্বল করা মানে আঞ্চলিক প্রতিরোধ বলয় ভাঙা। দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহ ও আতঙ্ক। যদিও ইরান বারবার বলেছে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, পশ্চিমা শক্তি সেটিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখেছে। তৃতীয়ত, ভূরাজনৈতিক বার্তা দেওয়া। যে কোনো রাষ্ট্র যদি পশ্চিমা কৌশলগত স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাকে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো মুসলিম বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রের নীরবতা। কেউ কেউ কূটনৈতিক ভাষায় উদ্বেগ জানিয়েছে, কেউ আবার সম্পূর্ণ নিরব থেকেছে। এই নিরবতা কি শুধুই কৌশল নাকি অর্থনৈতিক নির্ভরতার ফল। সিয়া সুন্নি যুক্তি দেখিয়ে ইরানের বিরোধিতা করার মাধ্যমে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তাদের ব্যর্থতার নিদর্শন স্থাপন করেছে। যখন একটি মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আক্রান্ত হয়, তখন অন্যদের চুপ থাকা ইতিহাসের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

‎ইরানের ওপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞের পর পুনরায় শক্তভাবে উঠে দাঁড়াতে হলে কয়েকটি সুসংগঠিত ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। সর্বোচ্চ নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পূরণ করতে হবে। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়। তাই জনগণের আস্থা বজায় রাখতে স্বচ্ছ ও ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। এই মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূরে সরিয়ে সরকার, বিরোধী শক্তি, সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনগণকে একই লক্ষ্য রাষ্ট্র রক্ষা ও পুনর্গঠন এর অধীনে আনতে হবে। জাতীয় সংকটে ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। তৃতীয়ত, অবকাঠামো পুনর্গঠন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিল্পকারখানা দ্রুত সংস্কার করতে হবে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বাস্তবতায় বিকল্প বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল নিতে হবে। চতুর্থত, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও আধুনিক করা। হামলা প্রমাণ করেছে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁক ছিল। সাইবার নিরাপত্তা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা উন্নত করা এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আকস্মিক আঘাত ঠেকানো যায়। পঞ্চমত, কূটনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি করা। মুসলিম বিশ্ব, এশীয় শক্তি ও ও নিরপেক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করতে হবে। আগ্রাসনের নৈতিক প্রশ্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তুললে কৌশলগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব। সবশেষে, মানবিক পুনর্বাসন ও জনমনের পুনর্গঠন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ-আতঙ্ক, হতাহত পরিবার ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে। ইরান শুধু প্রতিরোধে নয়, পুনর্গঠনে ও মানবিকতায়ও শক্তিশালী। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়াতে অস্ত্রের চেয়েও বড় প্রয়োজন সংগঠিত রাষ্ট্রচিন্তা, ধৈর্য এবং আত্মমর্যাদাবোধ। ইরান যদি কৌশলগতভাবে এই পদক্ষেপগুলো নেয়, তবে এই সংকটই তাদের নতুন শক্তির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

‎‎ইরান আজ একা লড়ছে কিন্তু একা মানে দুর্বল নয়। ইতিহাস সাক্ষী, যারা আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপস করেনি, তারা সাময়িক ক্ষতি স্বীকার করেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে গেছে। ‎খামেনির মৃত্যু ইরানের জন্য গভীর শোকের, কিন্তু এটি একই সঙ্গে প্রতিরোধের নতুন অধ্যায়ও। একটি জাতিকে নেতৃত্বহীন করে দিলে সে ভেঙে পড়বে এই ধারণা বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ‎মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো যদি আজ নীরব থাকে, তবে আগামীকাল তাদেরও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। ন্যায়বিচার কখনো শক্তির একচেটিয়া সম্পত্তি হতে পারে না। ইরানের প্রতি এই আগ্রাসন শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে হামলা নয়, এটি একটি স্বাধীন অবস্থানের বিরুদ্ধে বার্তা। আর সেই বার্তার জবাব দিতে হলে প্রয়োজন ঐক্য, নৈতিক সাহস এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বোধের পুনর্জাগরণ।

লেখক,
নুসরাত জাহান স্মরনীকা
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ইমেইলঃ [email protected]

আরও পড়ুন