বেকারত্ব ও অপরাধ: একটি আর্থ-সামাজিক সংকট
তানজিম হোসেন
প্রকাশিত: ০৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০০:৩০
তরুন বেকারের সফলতার সামনে হয়তো নীতিগত আদর্শই সবচেয়ে বড় বাধা। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সমান্তরালে মানবসমাজ যে কয়েকটি অভিশাপকে নিত্যসঙ্গী করে পথ চলছে, তার মধ্যে বেকারত্ব অন্যতম। একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল সমাজের মেরুদণ্ড হলো তার কর্মক্ষম জনশক্তি। কিন্তু যখন সেই জনশক্তির একটি বিশাল অংশ কর্মহীনতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, তখন কেবল ব্যক্তিজীবন নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই কম্পন অনুভূত হয়। বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক স্থবিরতার নাম নয়, এটি একটি মানসিক ও সামাজিক ব্যাধি, যা ধীরলয়ে মানুষকে অপরাধের অন্ধকার গলিপথে ঠেলে দেয়। বেকারত্ব ও অপরাধের সম্পর্কটি ঠিক যেন একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ; একটির বৃদ্ধি অন্যটিকে অনিবার্যভাবে ত্বরান্বিত করে।
বেকারত্ব বলতে কেবল আয়ের উৎসের অভাবকে বোঝায় না, বরং এটি মানুষের আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের সংকটেরও নামান্তর। একজন মানুষ যখন তার মেধা ও শ্রম বিনিয়োগের সুযোগ পায় না, তখন তার মধ্যে এক প্রকার চরম 'অস্তিত্ববাদী সংকট' (Existential Crisis) তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের কর্মহীনতা মানুষের আত্মবিশ্বাস ধুলিসাৎ করে দেয়; পরিবার ও সমাজের অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টি তাকে বিদ্রোহী করে তোলে। প্রবাদ আছে, "অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।" কর্মহীন অলস সময় মানুষকে নেতিবাচক চিন্তার দিকে ধাবিত করে, যা অপরাধের প্রাথমিক সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে।
বেকারত্ব কীভাবে একজন মানুষকে অপরাধী করে তোলে, তার পেছনে কাজ করে গভীর কিছু আর্থ-সামাজিক অনুঘটক। মানুষের মৌলিক চাহিদা—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান—যখন স্বাভাবিক উপায়ে পূরণ হয় না, তখন সে অস্বাভাবিক বা অবৈধ পথের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ক্ষুধার জ্বালা নৈতিকতাকে গ্রাস করে। জীবনধারণের তাগিদে চুরি, ছিনতাই বা ডাকাতির মতো ক্ষুদ্র অপরাধগুলো অনেক সময় বেকারত্বের প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে দেখা দেয়। এছাড়া সমাজে যখন বিত্তশালীদের প্রাচুর্য এবং বেকারদের বঞ্চনা পাশাপাশি অবস্থান করে, তখন বঞ্চিত শ্রেণির মনে তীব্র সামাজিক ক্ষোভের জন্ম হয়। এই ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় প্রতিহিংসা, যা অনেক সময় নাশকতা বা লুটতরাজের মতো অপরাধের রূপ নেয়। বেকারত্বের কারণে সৃষ্ট বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পেতে অনেক যুবক মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ে এবং এই নেশার টাকা জোগাড় করতে তারা জড়িয়ে পড়ে অন্ধকার জগতের সিন্ডিকেটের সাথে।
বিগত তিন বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বেকারত্ব ও অপরাধের এই পারস্পরিক সম্পর্কের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৪.২% থেকে ৪.৪৫%, যা ২০২৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৭% এ দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১১.৪৬% পর্যন্ত পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের প্রারম্ভিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে এই হার ৫.০০% স্পর্শ করার পথে।
এই ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হারের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অপরাধের গ্রাফও। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সাধারণ অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে:
চুরি (Theft): ২০২৪ সালে যেখানে মামলা ছিল ৮,৬৩২টি, ২০২৫ সালে তা ১২% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯,৬৭২টিতে।
ছিনতাই (Snatching): এই অপরাধটি সবচেয়ে ভয়াবহভাবে বেড়েছে—২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রায় ৩৭% বৃদ্ধি পেয়ে মামলা সংখ্যা ১,৯৩৫ এ পৌঁছেছে।
ডাকাতি (Robbery): গত তিন বছরে এই ক্ষেত্রে ৪৩% এর মতো আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি (প্রায় ৯.৭%) এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিম্ন আয়ের মানুষকে এবং হতাশগ্রস্ত যুবক শ্রেণিকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বেকারত্ব ও অপরাধ যখন হাত ধরাধরি করে চলে, তখন সমাজ এক অস্থিতিশীল অবস্থায় পতিত হয়। দেশের সৃজনশীল মেধা যখন কর্মসংস্থানের অভাবে অপরাধী হিসেবে পরিচিতি পায়, তখন জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়। অপরাধের হার বেড়ে গেলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে, বিদেশের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে। এছাড়া বেকারত্বের অভিশাপে অসংখ্য পরিবার ভেঙে যায়, যা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে অপরাধমূলক মানসিকতা তৈরির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বেকারত্ব ও অপরাধের এই বিষচক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল দমন-পীড়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। চিরাচরিত পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে যুবসমাজকে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। পাশাপাশি তরুণরা যাতে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সেজন্য জামানতবিহীন স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রসারের ব্যবস্থা করতে হবে। অপরাধীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে তার অপরাধের পেছনের কারণ চিহ্নিত করে তাকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা জরুরি।
বেকারত্ব ও অপরাধের সম্পর্কটি মূলত অভাব ও স্বভাবের দ্বন্দ্ব। বেকারত্ব মানুষকে অভাবের মুখে ঠেলে দেয়, আর অভাব মানুষের স্বভাবকে কলুষিত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যান আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত উন্নত হিসেবে গণ্য হয়, যখন তার প্রতিটি নাগরিকের হাত কোনো না কোনো সৃষ্টিশীল কর্মে লিপ্ত থাকে। অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন করতে হলে আগে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হবে। তারুণ্যের শক্তিকে যদি সঠিক দিশা দেওয়া যায়, তবে অপরাধের অন্ধকার হটিয়ে সমাজ আলোকিত হবে সৃজনশীলতার আলোয়।
লেখক,
তানজিম হোসেন
শিক্ষার্থী,লোকপ্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ইমেইল:[email protected]
আরও পড়ুন
- • মালয়েশিয়ার যাত্রা শেষে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
- • স্কুল দখল ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এমপির বিরুদ্ধে
- • হঠাৎ সাবস্ক্রিপশন চালু: ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ চালাতে দিতে হবে টাকা,
- • সংসদে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’র ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
- • পুশইন ইস্যুতে সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে: আইনমন্ত্রী
- • প্রধানমন্ত্রীর কাছে পঞ্চগড়ে ক্যান্টনমেন্টের স্থাপনের দাবি সারজিসের
- • পুরুষের যেসব ব্যক্তিত্ব মেয়েদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়
- • চালের বাজার স্থিতিশীল, মজুতেও নেই ঘাটতি: বাণিজ্যমন্ত্রী
- • অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ বাংলাদেশের
- • মহারাষ্ট্রে একই পরিবারের চারজনের রহস্যজনক মৃত্যু
- • বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার
- • যানজট নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নে সভা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
- • সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকার তিন বাস টার্মিনাল সরানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- • সৌদিতে চাকরি ও ভিসা প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন
- • বেনজীর আহমেদকে ফেরত নিতে ৩০ দিনের সময় দিল সংযুক্ত আরব আমিরাত
- • ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে ছয়জন নিহত
- • শুরু হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর প্রথম ম্যাচ
- • শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী
