০৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১৯:৩৫

শিরোনাম
তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতের বাজেটে থাকছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রান্তিক গ্রাহকদের বিবেচিনায় রেখে বিদ্যুৎমূল্য পুনঃবিবেচনার অনুরোধ জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর প্রাণহানি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’
শিরোনাম
তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতের বাজেটে থাকছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রান্তিক গ্রাহকদের বিবেচিনায় রেখে বিদ্যুৎমূল্য পুনঃবিবেচনার অনুরোধ জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর প্রাণহানি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’

রমজানে খাদ্য অপচয় : পর্দার আড়ালের নির্মম বাস্তবতা

রমজানে খাদ্য অপচয় : পর্দার আড়ালের নির্মম বাস্তবতা

কলাম লেখক

প্রকাশিত: ১৪ মার্চ, ২০২৬, ০০:৪৪

রমজান মাস মানেই সংযম, আত্মশুদ্ধি আর সহমর্মিতার শিক্ষা। এই মাসে মুসলিমরা দিনের দীর্ঘ সময় না খেয়ে থেকে ক্ষুধার অনুভূতিকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে, যেন তারা দরিদ্র মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় এই শিক্ষা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়। ইফতারের সময় ঘর, রেস্টুরেন্ট কিংবা বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের টেবিলে সাজানো থাকে অসংখ্য খাবার; ছোলা, বেগুনি, পিয়াজু, জিলাপি, হালিম, ফল, শরবত, বিরিয়ানি থেকে শুরু করে নানা পদ। খাবারের বাহার দেখে মনে হয় যেন ক্ষুধার মাস নয়, বরং ভোজনের উৎসব চলছে। আর এই অতিরিক্ত আয়োজনের ফলেই ঘটে বিপুল খাদ্য অপচয়।

বাংলাদেশে রমজান এলেই বাজারে খাদ্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। ইফতারির জন্য মানুষ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি খাবার কিনে। একটি পরিবারে পাঁচজন সদস্য থাকলেও ইফতারের টেবিলে প্রায় দশজনের খাবার সাজানো হয়। কিন্তু বাস্তবে সবাই অল্পই খেতে পারে, কারণ সারাদিন রোজা থাকার পর শরীর একসাথে বেশি খাবার গ্রহণ করতে পারে না। ফলে ইফতারের টেবিলের অনেক খাবার শেষ পর্যন্ত ফ্রিজে জমে থাকে, নষ্ট হয় বা ময়লার ঝুড়িতে চলে যায়। এই দৃশ্য শুধু একটি বাড়ির নয়, শহরের অসংখ্য পরিবারে প্রতিদিনই এমনটা ঘটছে।

খাদ্য অপচয়ের বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাও। বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি টন বা তার বেশি খাবার অপচয় হয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্য অনুযায়ী যা বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।  বাংলাদেশেও পরিস্থিতি খুব ভিন্ন নয়। শহুরে এলাকায় বিশেষ করে উৎসব বা বিশেষ সময়ে খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। রমজান মাসে হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং বড় ইফতার পার্টিগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার অব্যবহৃত থেকে যায়।

ঢাকার বড় বড় রেস্টুরেন্টগুলোতে রমজান মাসে ইফতার বুফের বিশেষ আয়োজন করা হয়। সেখানে মানুষ অনেক সময় চোখের চেয়ে বেশি খাবার প্লেটে তুলে নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই খাবারের বড় অংশ খাওয়া হয় না। রেস্টুরেন্টগুলো থেকে প্রতিদিন কয়েক কেজি খাবার সরাসরি ডাস্টবিনে ফেলা হয়। এই অপচয় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি নৈতিক প্রশ্নও তুলে ধরে; যেখানে একই শহরে হাজার হাজার মানুষ ঠিকমতো একবেলা খাবারও পায় না।

দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী এখনও দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি জীবনযাপন করছে। শহরের ফুটপাত, বস্তি কিংবা শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অনেকেই প্রতিদিন পর্যাপ্ত খাবার পায় না। রমজানের সময় তাদের জন্য ইফতার মানে কখনো একটি কলা আর একটু ছোলা, কখনো শুধু এক গ্লাস পানি। অথচ একই শহরের অন্য প্রান্তে ইফতারের টেবিলে অগণিত খাবার নষ্ট হয়ে যায়। এই বৈপরীত্য আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো।

রমজানের শিক্ষা আসলে সংযমের। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে অপচয় না করতে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, 'নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।' অথচ আমরা অনেক সময় অজান্তেই এই অপচয়ের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করি। সামাজিক মর্যাদা দেখানোর জন্য বা অতিথি আপ্যায়নের নামে অতিরিক্ত খাবারের আয়োজন করি। মনে করা হয়, টেবিলে বেশি খাবার থাকলেই সম্মান বাড়ে। কিন্তু সত্যিকারের সম্মান তো তখনই, যখন আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী আয়োজন করি এবং অবশিষ্ট খাবারকে সঠিকভাবে ব্যবহার করি।

অন্যদিকে খাদ্য অপচয়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছে পরিবেশগত প্রভাবও। একটি খাবার আমাদের টেবিলে পৌঁছাতে কৃষকের শ্রম, জমির পানি, সার, পরিবহন; সবকিছুর সমন্বয় লাগে। যখন সেই খাবার আমরা ডাস্টবিনে ফেলে দিই, তখন আসলে এই সমস্ত সম্পদেরও অপচয় হয়। অর্থাৎ খাদ্য অপচয় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। খাদ্য অপচয় বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ৮-১০% এর জন্য দায়ী।

তবে সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। অনেক দেশে এখন খাদ্য অপচয় কমানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিছু রেস্টুরেন্ট অতিরিক্ত খাবার সংগ্রহ করে দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করছে। আবার কোথাও 'ফুড ব্যাংক' তৈরি হয়েছে, যেখানে অব্যবহৃত খাবার জমা রেখে প্রয়োজনীয় মানুষদের দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইফতারের অবশিষ্ট খাবার সংগ্রহ করে পথশিশু বা শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নিচ্ছে। যদিও এই উদ্যোগ এখনও সীমিত।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও আমরা চাইলে অনেক পরিবর্তন আনতে পারি। ইফতারের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করা, প্লেটে যতটুকু খাওয়া সম্ভব ততটুকুই নেওয়া এবং অতিরিক্ত খাবার প্রতিবেশী বা দরিদ্র মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া; এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এতে শুধু অপচয় কমবে না, বরং রমজানের প্রকৃত চেতনাও বাস্তবায়িত হবে।

রমজান আমাদের শেখায় ক্ষুধার অনুভূতি, ধৈর্য এবং মানবিকতার পাঠ। কিন্তু যদি এই মাসেই আমরা অযথা খাবার নষ্ট করি, তাহলে সেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যটাই যেন হারিয়ে যায়। ইফতারের টেবিলে সাজানো প্রতিটি খাবারের পেছনে একজন কৃষকের ঘাম, একজন শ্রমিকের পরিশ্রম আর প্রকৃতির দান জড়িয়ে থাকে। তাই সেই খাবারকে সম্মান করা মানে শুধু একটি সম্পদকে বাঁচানো নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখা।

রমজান শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আমাদের আচরণই বলে দেবে আমরা এই মাস থেকে কী শিক্ষা নিয়েছি। যদি আমরা সংযম শিখতে পারি, অপচয় কমাতে পারি এবং অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি; তবেই রমজানের সত্যিকারের সৌন্দর্য প্রকাশ পাবে। আর তখন ইফতারের টেবিল শুধু খাবারের সমারোহ নয়, বরং মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠবে।

লেখক,
আরিফুল ইসলাম রাফি 
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা। 
ইমেইল: [email protected]

আরও পড়ুন