হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলাধুলা
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
প্রকাশিত: ১৫ মার্চ, ২০২৬, ০১:৩২
এক সময় গ্রামবাংলার নিস্তরঙ্গ বিকেলে মেঠোপথ আর সবুজ মাঠগুলো মুখরিত থাকত কিশোর-কিশোরীদের প্রাণবন্ত কলকাকলিতে। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলতে শুরু করত, তখন পাড়ায় পাড়ায় শুরু হতো গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্দা, ডাংগুলি কিম্বা হা-ডু-ডু’র লড়াই। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর বিবর্তনে আজ সেই চিরচেনা দৃশ্যপট প্রায় সম্পূর্ণ বদলে গেছে। শৈশবের সেই ধুলোমাখা আনন্দময় দিনগুলো এখন বন্দি হয়ে গেছে চার দেয়ালের কৃত্রিম খাঁচায় আর স্মার্টফোনের নীল আলোয়। প্রযুক্তির তীব্র জোয়ার আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক বড় অংশ—এই লোকজ খেলাধুলা। বাঙালির এই নিজস্ব খেলাগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল সামাজিক মেলবন্ধনের এক অনন্য সেতু। লুকোচুরি, কুতকুত, ইচিং-বিচিং বা বৌ-চি’র মতো খেলাগুলো কোনো দামী সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল ছিল না; স্রেফ এক টুকরো ভাঙা হাড়ি বা গাছের ডাল দিয়েই চলত হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করা উৎসব। তবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসব খেলার নাম এখন অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো শোনায়। গবেষণায় দেখা যায়, গত দুই দশকে কেবল আমাদের অবহেলার কারণে গ্রাম ও শহর অঞ্চল থেকে প্রায় ৩০টিরও বেশি দেশীয় খেলা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
এই হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে বর্তমানের ডিজিটাল আসক্তি। এখনকার শিশুরা খোলা মাঠে দৌড়াদৌড়ির চেয়ে ভিডিও গেম, ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মাঠের ফুটবল এখন মোবাইলের স্ক্রিনে 'ফিফা' গেমে রূপান্তরিত হয়েছে, যার ফলে শিশুদের কেবল শারীরিক স্থূলতাই বাড়ছে না, বরং তাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশেও তৈরি হচ্ছে এক বিশাল শূন্যতা। এর পাশাপাশি বড় শহরগুলোতে মাঠের তীব্র সংকট আর গ্রামীণ এলাকায় কৃষি জমি ভরাট করে দালানকোঠা নির্মাণের ফলে খেলার জায়গাগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। যেটুকু সময় শিশুরা পায়, তার সিংহভাগ কাটে কোচিং আর স্কুলের ভারী ব্যাগের নিচে চাপা পড়ে। ফলে 'শারীরিক শ্রমের' বদলে 'ভার্চুয়াল বিনোদনই' তাদের একমাত্র সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, লোকজ খেলাধুলা মানুষের ধৈর্য, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করত। এসব খেলা হারিয়ে যাওয়ায় বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সহনশীলতা কমছে এবং একাকীত্ব বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সৃষ্টি করছে।
তবে আমাদের শিকড়কে রক্ষা করার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। হারানো ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। প্রতিটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অন্তত সপ্তাহে একদিন দেশীয় খেলাধুলার বাধ্যতামূলক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে। একই সাথে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত কাবাডি বা লাঠি খেলার মতো ইভেন্টগুলোকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু শৈশবের সেই নির্মল আনন্দ আর মাটির ঘ্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আমরা যদি আজ আমাদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে না পারি, তবে আগামীর প্রজন্মের কাছে নিজেদের জাতিগত পরিচয় তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই অন্তত শিশুদের সুস্থ বিকাশের স্বার্থে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে সেই হারানো খেলার মাঠে, যেখানে ধুলোবালির প্রতিটি রেণুতে মিশে আছে বাঙালির প্রাণভোমরা।
লেখক,
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
আরও পড়ুন
- • লক্ষ্মীপুরে মা-মেয়েসহ একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা
- • ভেনেজুয়েলা ভূমিকম্পে প্রাণহানি ‘ভয়াবহ’ হতে পারে, সহায়তার ঘোষণা ট্রাম্পের
- • অ্যাপ ডাউনলোডে অসতর্কতা, মুহূর্তেই খোয়া যেতে পারে ব্যাংকের তথ্য
- • হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৬৪ হাজারের বেশি হাজি, মৃত্যু ৫৪ জনের
- • ঢাকা-তেহরান সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রস্তাব ইরানের
- • সাপাহার সীমান্তে ৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা, প্রতিহত করল বিজিবি
- • বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার
- • আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দরপতন অব্যাহত
- • চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড
- • ডেভিডের হ্যাটট্রিকে কাতারকে উড়িয়ে দিল কানাডা
- • কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ
- • বন্ধ কারখানাগুলোয় বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- • মালয়েশিয়ার ২ হাজার বন্দিদের ফেরানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
- • বগুড়ার সেই দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর
- • বগুড়ার ৩ ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- • মালয়েশিয়ার পথে রওনা হলেন প্রধানমন্ত্রী
- • ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিল ইরান
- • যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বৈঠকে সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান
