২০ জুন ২০২৬, শনিবার, ১৮:৫২

শিরোনাম
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ১৭টি চুক্তির সম্ভাবনা, আলোচনায় থাকবে তিস্তা প্রকল্প: পররাষ্ট্র সচিব আজ আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস দেশে খাদ্যশস্যের মজুত ২০ লাখ ৬০ হাজার টন ছাড়ালো বাংলাদেশের নারী উন্নয়নে অগ্রগতির প্রশংসা ইউএন উইমেনের শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ জাতি গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন তারেক রহমান, গুরুত্ব পাচ্ছে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ
শিরোনাম
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ১৭টি চুক্তির সম্ভাবনা, আলোচনায় থাকবে তিস্তা প্রকল্প: পররাষ্ট্র সচিব আজ আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস দেশে খাদ্যশস্যের মজুত ২০ লাখ ৬০ হাজার টন ছাড়ালো বাংলাদেশের নারী উন্নয়নে অগ্রগতির প্রশংসা ইউএন উইমেনের শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ জাতি গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন তারেক রহমান, গুরুত্ব পাচ্ছে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট: পাম্পের দীর্ঘ লাইন আমাদের কী শেখাচ্ছে?

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট: পাম্পের দীর্ঘ লাইন আমাদের কী শেখাচ্ছে?

তামান্না ইসলাম

প্রকাশিত: ১৮ মার্চ, ২০২৬, ০০:৩৬

পেট্রোলের পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য এখন পরিচিত বিষয়। রাস্তায় বের হলেই দেখা যাচ্ছে লম্বা লাইন, অনেক পাম্পে "তেল নেই" লেখা সাইনবোর্ড। রাজধানী থেকে মফস্বল - সব জায়গায় একই ছবি। অথচ মাত্র কিছু দিন আগেও এই অবস্থা ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজার।
যুদ্ধ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে, প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল জোটের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি - বিশ্বের তেল ও এলএনজি সরবরাহের অন্যতম প্রধান জলপথ - ঘিরে এখন চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরান এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল না করার জন্য সতর্কতা জারি করায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বিকল্প পথে জাহাজ ঘুরিয়ে নিচ্ছে - এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।

এশিয়ার বাজারে মার্চের শুরুতে মাত্র একদিনেই তেলের দাম বাড়ে ১৩ শতাংশ, এবং ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। গত এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছার আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকরা। এই ধাক্কা যে বাংলাদেশে আসবে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ বাংলাদেশ নিজের প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় পুরোটাই বাইরে থেকে আমদানি করে।

বাংলাদেশের সার্বিক জ্বালানি তেলের চাহিদার মাত্র ৮ শতাংশ স্থানীয়ভাবে মেটানো সম্ভব হয়, আর বাকি প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানি করতে হয়। শুধু তেল নয়, গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহের যে পরিমাণ, তার মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুটই আসে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে - যার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কাতার থেকে আসে প্রায় ৪০ লাখ টন।
কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে কাতারও থমকে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার পর কাতার তার বিখ্যাত রাস লাফান গ্যাস কমপ্লেক্সে সাময়িকভাবে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই কমপ্লেক্সে ১৪টি এলএনজি 'ট্রেন' পরিচালিত হয়, যার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ টন। এটা শুধু কাতারের সমস্যা নয় — এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

দেশের মানুষ প্রথমে পরিস্থিতির গুরুত্ব টের পায় পেট্রোলের পাম্পে গিয়ে। হঠাৎ করেই পাম্পে দীর্ঘ লাইন, তেল ফুরিয়ে যাওয়ার খবর - সব মিলিয়ে একধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাম্প মালিকরা অভিযোগ করেন যে সরকার একদিকে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুদ থাকার কথা বলছে, অন্যদিকে রেশনিং করে তেল সরবরাহের নির্দেশ দিচ্ছে - এই টানাপোড়েনে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, এবং পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি, বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটছে। এই আতঙ্কের একটা নিজস্ব গতি আছে। অর্থনীতিতে যাকে বলে "প্যানিক বায়িং" - যখন মানুষ ভয় পেয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে রাখে - সেটাই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। বাস্তবে সরবরাহে সংকট যতটুকু, আতঙ্ক তার চেয়ে অনেক বেশি সংকট তৈরি করতে পারে- বাংলাদেশও এই সত্য বারবার টের পেয়েছে,যেমন- ২০২০ সালে করোনা আতঙ্কে হঠাৎ করেই চাল-ডাল-তেলের দোকানে লম্বা লাইন পড়েছিল, অথচ সরবরাহে তেমন কোনো সংকট ছিল না- শুধু ভয়ই মানুষকে দোকানে টেনে নিয়েছিল। সরকার পরিস্থিতি সামলাতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি তেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, পেট্রোল পাম্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহও সীমিত করা হয়েছে। বিপিসির তথ্য অনুসারে, বর্তমানে ডিজেল প্রায় দুই সপ্তাহের মতো মজুদ রয়েছে- পরিস্থিতি বিপর্যস্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যাবে না। ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে খোলা বাজার থেকে তিন কার্গো এলএনজি কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সরকারি দপ্তরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। ইতিবাচক খবর হলো, পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে যে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে তেল রেশনিং তুলে নেওয়া হচ্ছে -এখন পর্যাপ্ত পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যাবে। এটা অবশ্যই স্বস্তির খবর, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান এখনো নাগালের বাইরে ।

বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারিভাবে নির্ধারিত জ্বালানির দাম- ডিজেল ১০২ টাকা, কেরোসিন ১১৪ টাকা, অকটেন ১২২ টাকা এবং পেট্রোল ১১৮ টাকা লিটার - এই দাম চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যেভাবে লাফাচ্ছে, এই দর ধরে রাখা সরকারের পক্ষে কতটা সম্ভব, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে, যার ফলে সরকারের ভর্তুকির অঙ্কও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে একই চাপ। ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম ২১ শতাংশ বাড়িয়েছে, পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ শতাংশ বেড়েছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রেও এক সপ্তাহে পেট্রোলের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে দীর্ঘদিন বিনিয়োগ না হওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। এলএনজিকে সমাধান ভাবা হয়েছিল, কিন্তু এটা বাংলাদেশকে অস্থির বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে।গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মোট ১০৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প চলমান বা পরিকল্পনায় রয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যদি আরও উত্তপ্ত হয়, এই বিপুল বিনিয়োগই বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এই সংকট সমাধানে দুই ধরনের পদক্ষেপ দরকার - তাৎক্ষণিক আর দীর্ঘমেয়াদি।

তাৎক্ষণিকভাবে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত পরিহার, ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে মিতব্যয়িতা- এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প কোনো পথ নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার, কারণ এটা আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা দিতে পারে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি - এগুলো আর কল্পনা নয়, বরং এখন বাস্তব এবং সাশ্রয়ী। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও বিনিয়োগ বাড়ানো, জ্বালানির মজুদ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ উৎসের বৈচিত্র্য আনাও জরুরি।

পেট্রোলের পাম্পে লম্বা লাইন শুধু একটা অসুবিধার ছবি নয় - এটা আমাদের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য ঝাঁকুনি লাগলেই দেশের ভেতরে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয় - এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে এই সংকট বারবার ফিরে আসবে, হয়তো আরও তীব্র আকারে।
সঠিক পরিকল্পনা, দেশীয় উৎসে বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে স্থায়ী যাত্রা শুরু না হলে, প্রতিটি যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকটে বাংলাদেশ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে - হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করবে অন্যের তেলের জন্য।

লেখক,
তামান্না ইসলাম
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ইমেইল : [email protected] 

আরও পড়ুন