০৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১৮:২৭

শিরোনাম
২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতের বাজেটে থাকছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রান্তিক গ্রাহকদের বিবেচিনায় রেখে বিদ্যুৎমূল্য পুনঃবিবেচনার অনুরোধ জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর প্রাণহানি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধির সাক্ষাৎ
শিরোনাম
২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতের বাজেটে থাকছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রান্তিক গ্রাহকদের বিবেচিনায় রেখে বিদ্যুৎমূল্য পুনঃবিবেচনার অনুরোধ জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর প্রাণহানি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধির সাক্ষাৎ

‘বিদ্যুৎ বাঁচবে না বাড়বে?’: অনলাইন ক্লাস নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্ন

‘বিদ্যুৎ বাঁচবে না বাড়বে?’: অনলাইন ক্লাস নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্ন

মো: রিশাদ আহমেদ

প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০১:১৯

শহরের বাতাসে এখন এক অদ্ভুত দ্বিধার গন্ধ। যেন সন্ধ্যার আকাশে মেঘ জমেছে, কিন্তু বৃষ্টি নামবে কি না—সেই অনিশ্চয়তায় মানুষ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। বিদ্যুতের আলো জ্বলে উঠলেও প্রশ্নটা অন্ধকারেই রয়ে যায়—এই আলো কি সত্যিই বাঁচবে, নাকি অন্য কোনো পথে গিয়ে আরও বেশি জ্বলে উঠবে? শিক্ষা এখন কেবল পাঠ্যবইয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে পর্দার ভেতর, তারের ভেতর, আর মানুষের মনে। এই পরিবর্তনের সীমানায় দাঁড়িয়ে অনলাইন ক্লাস নিয়ে জনমনে যে নানামুখী প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তা যেন সময়েরই এক প্রতিচ্ছবি।

বর্তমান বাস্তবতায় এসে বিষয়টি আর কেবল একটি শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তির এক জটিল সমীকরণ। শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন ক্লাস চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতার ছায়া। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে। একই সঙ্গে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর দিকটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার একটি মিশ্র শিক্ষাপদ্ধতির পরিকল্পনা করছে, যেখানে সপ্তাহের তিন দিন সরাসরি এবং তিন দিন অনলাইনে ক্লাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছয় দিন খোলা রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে, যাতে ছুটিজনিত শিক্ষার ঘাটতি পূরণ করা যায়। আপাতত এই পরিকল্পনা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের বড় অংশই বাসনির্ভর।

তবে কাগজে-কলমে পরিকল্পনা যতই সুশৃঙ্খল মনে হোক, জনমতের আয়নায় তার প্রতিফলন কিন্তু একরৈখিক নয়। একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জরিপে দেখা গেছে, প্রায় পঞ্চান্ন শতাংশ মানুষ জ্বালানি সাশ্রয়ের স্বার্থে এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু তার বিপরীতে তেতাল্লিশ শতাংশ মানুষ সরব বিরোধিতা করেছেন। এই বিভাজন কেবল মতের পার্থক্য নয়; এটি বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। যারা সমর্থন করছেন, তারা মনে করছেন রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কমলে জ্বালানি খরচও কমবে, শহরের যানজট কিছুটা হলেও লাঘব হবে। অন্যদিকে যারা বিরোধিতা করছেন, তাদের চোখে এই পরিকল্পনা এক নতুন ধরনের সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

কারণগুলোর ভেতরে ঢুকলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের যুক্তিটি অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ। বিদ্যালয়ে আলো-ফ্যান বন্ধ থাকলেও, শিক্ষার্থীরা যদি বাসায় বসে মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করে, তবে সেই বিদ্যুৎ খরচ কি সত্যিই কমবে? বরং বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের চাপ আরও বাড়তে পারে, লোডশেডিংয়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য এবং ধীরগতি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি বাধা। শহরের বাইরে বা মফস্বল এলাকায় এই সমস্যা আরও প্রকট। অনেক পরিবার এখনো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় করতে হিমশিম খায়। ফলে এই ব্যবস্থায় একটি নতুন বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তৃতীয়ত, সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার অভাব শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিদ্যালয় কেবল পাঠ শেখার জায়গা নয়; এটি বন্ধুত্ব, সহানুভূতি আর সহাবস্থানের পাঠও দেয়। পর্দার আড়ালে বসে সেই অভিজ্ঞতা পাওয়া সম্ভব নয়। চতুর্থত, করোনাকালীন অনলাইন ক্লাসের তিক্ত অভিজ্ঞতা এখনো অনেকের মনে দাগ কেটে আছে। তখন অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছিল, তৈরি হয়েছিল শেখার ঘাটতি। সেই স্মৃতি এখনো অনেকের মনে শঙ্কা জাগায়। পঞ্চমত, অভিভাবকদের একটি অংশ মনে করেন, সারাদিন পর্দার সামনে বসে থাকলে শিশুদের চোখের সমস্যা, ক্লান্তি এবং একঘেয়েমি বাড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সমাধান খুঁজে বের করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমেই প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা। কেবল শহরের জন্য নয়, দেশের সব অঞ্চলের কথা মাথায় রেখে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। ইন্টারনেটের গতি ও খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে যন্ত্রপাতি সরবরাহের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পাঠদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। অনলাইন ক্লাস যেন একঘেয়ে বক্তৃতায় পরিণত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা ভার্চ্যুয়াল পরিবেশেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখতে পারেন। পাশাপাশি, কারিগরি ও ব্যবহারিক ক্লাসগুলো সরাসরি ল্যাবরেটরিতে চালু রাখার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক একটি দিক, যা শিক্ষার মান ধরে রাখতে সহায়ক হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষকদের উপস্থিতি। অনলাইন ক্লাস চলাকালীন তাদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে ক্লাস নেওয়ার শর্তটি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে ক্লাসের মান বজায় রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তার ব্যবস্থা থাকলে তারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। 

সবশেষে, এই পুরো উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করছে সঠিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর। বিদ্যুৎ সাশ্রয় যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্যটি বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তবতার প্রতিটি দিক গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মতামতের জায়গা থেকে বলা যায়, অনলাইন ক্লাস চালুর ধারণাটি সময়োপযোগী হলেও তা হঠাৎ করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং ধীরে ধীরে, পরীক্ষামূলকভাবে এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতির মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ শিক্ষা কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে ভুল হলে সহজে সংশোধন করা যায়। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—বিদ্যুৎ কি সত্যিই বাঁচবে, নাকি অন্য কোনো খাতে গিয়ে আরও বেশি খরচ হবে? হয়তো এর উত্তর এখনই স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই আলোচনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের পথরেখা। সেই পথ যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়, সেটিই এখন সবার প্রধান দায়িত্ব।

লেখক,
মো: রিশাদ আহমেদ
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 
ইমেইল : [email protected]

আরও পড়ুন