ঈদকে ঘিরে ঘরে ফেরা মানুষের গল্প
আরিফুল ইসলাম রাফি
প্রকাশিত: ১৬ মার্চ, ২০২৬, ০০:৩৫
ঈদ আসার আগের দিনগুলোতে ঢাকার বাতাসে যেন এক ধরনের অস্থিরতা ভেসে থাকে। ব্যস্ত শহরটা তখনও একই রকম শব্দে ভরা;গাড়ির হর্ন, মানুষের তাড়া, দোকানের আলো। কিন্তু মানুষের ভেতরে ভেতরে তখন অন্য এক টান কাজ করে। সেই টান ঘরের টান, শেকড়ের টান। সারা বছর যারা কাজের চাপে, পড়াশোনার ব্যস্ততায় কিংবা জীবিকার তাগিদে শহরে পড়ে থাকে, ঈদ এলেই তাদের মন হঠাৎ করে গ্রামের পথের দিকে ছুটতে থাকে। মনে হয়, অনেক দিন দেখা হয়নি সেই উঠানটা, যেখানে শৈশবে দৌড়ে বেড়ানো ছিল; অনেক দিন শোনা হয়নি মায়ের ডাক, অনেক দিন বসা হয়নি বাবার পাশে।
ঈদের আগের সপ্তাহ থেকেই ঢাকার চেহারা বদলে যেতে শুরু করে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাটসহ সব জায়গায় তখন মানুষের ঢল নামে। কেউ কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে লাইনে অপেক্ষা করছে, কেউ আবার ফোনে বাড়ির খবর নিচ্ছে, 'মা, আমি রওনা দিয়েছি, রাতে পৌঁছাবো।' মানুষের চোখে তখন ক্লান্তি থাকে, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেও এক ধরনের আলো থাকে। সেই আলো আসলে বাড়ি ফেরার আনন্দ। টিকিট পাওয়া যেন রীতিমতো এক যুদ্ধ। অনেকেই আগেভাগে টিকিট কেটে রাখে, আবার অনেকেই শেষ মুহূর্তে দৌড়ঝাঁপ করে। কেউ স্টেশনে রাত কাটায়, কেউ বাস কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। তবুও বিরক্ত ছাপিয়ে তাদের মাঝে কাজ করে এক প্রশান্তি। কারণ সবাই জানে, এই কষ্টটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিলবে এক অদ্ভুত সুখে, বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে মায়ের মুখ দেখার সুখে। বাস বা ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে যে দৃশ্য দেখা যায়, সেটা এক অদ্ভুত আবেগের। কেউ জানালার পাশে বসে আছে, কেউ সিটের নিচে ব্যাগ গুঁজে রাখছে। বাসের ভেতর থেকে কেউ হাত নেড়ে বিদায় দিচ্ছে, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে বলছে, 'ভালো থেকো।' গাড়ি চলতে শুরু করলেই শহরের আলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে থাকে। তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে অনেকেই চুপচাপ হয়ে যায়। এই শহরেই তো তারা সারা বছর যুদ্ধ করে; কাজের জন্য, টাকার জন্য, স্বপ্নের জন্য। কিন্তু সেই যুদ্ধের মাঝেও একটা সময় আসে, যখন মানুষ শুধু একটু শান্তি চায়, একটু আপনজনের কাছে ফিরতে চায়। ঢাকা থেকে দূরে যেতে যেতে রাস্তার দৃশ্য বদলাতে থাকে। উঁচু দালান কমে আসে, বদলে যায় চারপাশের রং। কোথাও ধানের ক্ষেত, কোথাও নদীর ওপর সেতু, কোথাও ছোট ছোট বাজার। অনেকেই তখন ফোন বের করে ছবি তোলে, আবার কেউ নিঃশব্দে বাইরে তাকিয়ে থাকে। সেই দৃশ্যের ভেতরেই যেন লুকিয়ে থাকে শৈশবের অনেক স্মৃতি।
এদিকে শহরটাও ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। যে ঢাকায় প্রতিদিন মানুষের ঢল থাকে, সেই শহরের রাস্তা ঈদের সময় আশ্চর্যভাবে শান্ত হয়ে যায়। অনেক দোকান বন্ধ থাকে, অনেক অফিসে তালা ঝুলে। বিকেলের দিকে রাস্তায় গাড়িও কম দেখা যায়। যারা শহরে থেকে যায়, তারা তখন বুঝতে পারে, এই শহরের আসল প্রাণ তো সেই মানুষগুলোই, যারা ঈদে বাড়ি চলে গেছে। গ্রামে পৌঁছানোর মুহূর্তটা যেন অন্যরকম। বাস বা ট্রেন থেকে নামতেই পরিচিত গন্ধ নাকে আসে; মাটির গন্ধ, গাছের গন্ধ, নদীর বাতাস। বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এই পথ তো অনেক চেনা। দরজায় পৌঁছানোর আগেই কেউ হয়তো বলে ওঠে, 'ওই তো এসেছে!' তারপর একে একে সবাই বেরিয়ে আসে। মা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, বাবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাসে, ছোট ভাই-বোন দৌড়ে এসে ব্যাগ টেনে নেয়। মায়ের সাথে দেখা হওয়ার সেই মুহূর্তটা কথায় বোঝানো কঠিন। অনেক সময় মা কিছু বলে না, শুধু মাথায় হাত রাখে। সেই স্পর্শেই যেন শহরের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। বাবাও হয়তো জিজ্ঞেস করে, 'কেমন আছো?' কিন্তু সেই প্রশ্নের ভেতরে থাকে অনেক না বলা ভালোবাসা। ঈদের আগের রাতগুলো গ্রামে অন্যরকম আনন্দে ভরা থাকে। উঠানে বসে গল্প, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরম খাবারের গন্ধ, দূরে কোথাও মাইকে ঈদের গান। ছোটরা নতুন কাপড় পরে ঘুরে বেড়ায়, বড়রা বাজার থেকে নানা জিনিস নিয়ে আসে। গ্রামের আকাশটাও যেন তখন একটু বেশি উজ্জ্বল লাগে।
ঈদের সকালটা যেন একেবারে অন্যরকম। ভোরে উঠে সবাই প্রস্তুত হয়। নতুন কাপড়, সুগন্ধি, আর এক ধরনের আনন্দের উত্তেজনা। মসজিদের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় গ্রামের অনেক পুরোনো মুখ, যাদের সাথে হয়তো অনেক দিন দেখা হয়নি। সবাই একে অপরকে দেখে হাসে, কোলাকুলি করে। বাড়িতে ফিরে শুরু হয় খাওয়াদাওয়া। টেবিলে নানা রকম খাবার; সেমাই, পোলাও, মাংস। সারাদিন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া, বন্ধুদের সাথে দেখা, পুরোনো স্মৃতি নিয়ে আড্ডা; সব মিলিয়ে সময়টা খুব দ্রুত চলে যায়। বিকেলের দিকে অনেকেই গ্রামের মাঠে হাঁটতে যায়, কেউ নদীর ধারে বসে থাকে। সেই সময়টা যেন এক ধরনের শান্তির। কিন্তু আনন্দের এই সময়টা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ঈদের কয়েক দিন পরই আবার ফিরে যাওয়ার কথা মনে পড়ে। তখন মনটা একটু ভারী হয়ে যায়। মা হয়তো বলে, 'আরেকটা দিন থাক।' কিন্তু কাজের টান, দায়িত্বের টান মিলিয়ে থাকা সম্ভব হয় না। বিদায়ের দিন সকালে থেকেই একটা অদ্ভুত নীরবতা থাকে। ব্যাগ গুছানো হয়, সবাই চুপচাপ থাকে। মা আবারও কিছু খাবার গুছিয়ে দেয় ব্যাগে। বাবা হয়তো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। বাস চলতে শুরু করলে জানালার বাইরে দেখা যায়, বাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। আবার শুরু হয় শহরের পথে ফেরা। আবার সেই ব্যস্ততা, সেই কাজের চাপ, সেই প্রতিদিনের সংগ্রাম। কিন্তু মন জানে, আরেকটা ঈদ আসবে, আবার একদিন এই পথ ধরে বাড়ি ফেরা হবে।
এইভাবেই ঈদকে ঘিরে মানুষের ঘরে ফেরা যেন এক চক্রের মতো। শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে আবার শহর। কিন্তু এই ছোট ছোট যাত্রার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে মানুষের সবচেয়ে বড় অনুভূতিগুলো; ভালোবাসা, টান, আর নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। হয়তো এ কারণেই ঈদ মানে শুধু একটা উৎসব নয়; ঈদ মানে মানুষের ঘরে ফেরা, মানুষের আপনজনের কাছে ফিরে যাওয়া, আর একটু সময়ের জন্য হলেও নিজের সত্যিকারের পৃথিবীটাকে ছুঁয়ে দেখা।
লেখক,
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
ইমেইল: [email protected]
আরও পড়ুন
- • ডিপফেক ও এআই অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রীতি জিন্টার যুদ্ধ
- • সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা হারুন অর রশীদ আর নেই
- • চাকরির প্রলোভনে চট্টগ্রামে নিয়ে বিধবাকে গণধর্ষণ, অভিযুক্ত গ্রেফতার
- • ফুটবল ইতিহাসের অজেয় জুটি: পেলে এবং মানে গারিঞ্চা
- • ৭২ ঘণ্টায় দেশজুড়ে বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা
- • ‘সিক্সটিন হানড্রেড মাইল অফ কাঁচা রাস্তা’, সমালোচনার পর মুখ খুললেন এমপি জেবা
- • গ্রুপ পর্বে নেইমারকে পাচ্ছে না ব্রাজিল, জানালেন চিকিৎসকরা
- • বাইক দুর্ঘটনায় আহত জোভান
- • বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার
- • সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকার তিন বাস টার্মিনাল সরানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- • মহারাষ্ট্রে একই পরিবারের চারজনের রহস্যজনক মৃত্যু
- • যানজট নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নে সভা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
- • বেনজীর আহমেদকে ফেরত নিতে ৩০ দিনের সময় দিল সংযুক্ত আরব আমিরাত
- • প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষ্যে বন্ধ থাকবে মৌলভীবাজারের ৯২ চা বাগান
- • সৌদিতে চাকরি ও ভিসা প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন
- • প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- • ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে ছয়জন নিহত
- • যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরিতে স্কাইডাইভিং বিমান বিধ্বস্ত, পাইলটসহ ১২ জন নিহত
