০৭ জুন ২০২৬, রবিবার, ০১:৩৩

শিরোনাম
মধ্যরাতে দেশে ফিরছে লেবাননে নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ এমপি-মন্ত্রীদের মাঠে সক্রিয় থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ মওকুফ সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামীকাল পে-স্কেল বাস্তবায়নে নতুন আলটিমেটাম দিলেন চাকরিজীবীরা ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু সীমান্তে ভারতের পুশ ইনের সব অপচেষ্টা প্রতিহত করার দাবি বিজিবির
শিরোনাম
মধ্যরাতে দেশে ফিরছে লেবাননে নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ এমপি-মন্ত্রীদের মাঠে সক্রিয় থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ মওকুফ সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামীকাল পে-স্কেল বাস্তবায়নে নতুন আলটিমেটাম দিলেন চাকরিজীবীরা ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু সীমান্তে ভারতের পুশ ইনের সব অপচেষ্টা প্রতিহত করার দাবি বিজিবির

রোহিঙ্গা: ভুলে যাওয়া সংকটের ভার

রোহিঙ্গা: ভুলে যাওয়া সংকটের ভার

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

প্রকাশিত: ০৭ জুন, ২০২৬, ০০:০৪

"যে অতিথি একদিন আশ্রয় নেয়, সে যদি বছরের পর বছর থেকে যায়, তখন আশ্রয়দাতার ঘরও একসময় সংকুচিত হয়ে আসে।"

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট যেন এমনই এক বাস্তবতা। কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, বিশ্বনেতা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট যেন আন্তর্জাতিক মনোযোগের তালিকা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে আগের মতো শিরোনাম হয় না, বিশ্বনেতাদের বক্তব্যেও খুব একটা স্থান পায় না। অথচ সংকটটি শেষ হয়ে যায়নি; বরং এর বোঝা আরও ভারী হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। বছরের পর বছর ধরে তারা কক্সবাজার ও ভাসানচরের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। শুরুতে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও মানবিক তৎপরতা ছিল ব্যাপক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাতা সংস্থাগুলোর আগ্রহ কমেছে, অর্থায়ন কমেছে এবং নতুন বৈশ্বিক সংকটগুলো আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকট এখন এক ধরনের ‘ভুলে যাওয়া সংকটে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কখনোই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ ছিল না। এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। জাতিগত নিপীড়ন, নাগরিকত্বহীনতা এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্যের কারণে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমস্যার সৃষ্টি অন্যত্র হলেও এর সবচেয়ে বড় মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বহন করছে বাংলাদেশ। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে দীর্ঘ সময় আশ্রয় দেওয়া নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ।

সমীক্ষা ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজার অঞ্চলে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর কারণে স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, ভূমির ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। স্থানীয় জনগণের একটি অংশ মনে করে, আন্তর্জাতিক সহায়তার বড় অংশ রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যয় হলেও তাদের নিজস্ব জীবনযাত্রার উন্নয়নে সেই অনুপাতে মনোযোগ দেওয়া হয় না। ফলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুধু অর্থনীতি বা পরিবেশ নয়, নিরাপত্তার বিষয়টিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী যখন অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করে, তখন সেখানে অপরাধচক্র, মাদক পাচার কিংবা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে শিবিরকেন্দ্রিক সহিংসতা, হত্যা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর সামনে এসেছে। যদিও অধিকাংশ রোহিঙ্গা শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করতে চায়, তবুও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তাহলে প্রশ্ন হলো, কেন এই সংকটের সমাধান হচ্ছে না? মূল কারণ হলো, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য এখনো কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান তৈরি হয়নি। মিয়ানমারে স্থিতিশীল পরিস্থিতি নেই। রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মতো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। ফলে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপও আগের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে রোহিঙ্গা ইস্যু আর আগের মতো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। একটি সংকট যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, ততই তা স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। যদি বিশ্ব ধীরে ধীরে রোহিঙ্গা সংকটকে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও কমে যেতে পারে। অথচ এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক সংকট।

এ সমস্যা থেকে সমাধানের উপায় হচ্ছে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়, বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতেও রোহিঙ্গা ইস্যুকে সক্রিয়ভাবে তুলে ধরতে হবে। বিশ্ব যেন এই সংকটকে ভুলে না যায়, সেই দায়িত্ব বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে পালন করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। শুধু মানবিক সহায়তা নয়, মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি হয়। সংকটের মূল কারণ সমাধান ছাড়া কেবল ত্রাণ সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। এছাড়া স্থানীয় জনগণের স্বার্থকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাড়ানো প্রয়োজন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি কমবে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।

রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু এর অস্তিত্ব নয়, বরং এটিকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা। কারণ কোনো সংকট যখন আলোচনার বাইরে চলে যায়, তখন তার সমাধানের সম্ভাবনাও দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধের পুনর্জাগরণ। বিশ্বের বিবেক যদি এই সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে বোঝা কেবল একটি দেশের কাঁধে এসে পড়বে। আর ইতিহাস বলে, এমন বোঝা দীর্ঘদিন বহন করা কোনো দেশের পক্ষেই সহজ নয়। রোহিঙ্গারা যেমন তাদের হারানো মাতৃভূমিতে ফিরতে চায়, তেমনি বাংলাদেশও চায় এই মানবিক অধ্যায়ের একটি ন্যায়সঙ্গত সমাপ্তি। কারণ আশ্রয় দেওয়া মানবতা, কিন্তু একটি সংকটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বহন করা কোনো রাষ্ট্রের একার দায়িত্ব হতে পারে না।

লেখক,

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

ইমেইলঃ [email protected]

আরও পড়ুন