২৮ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার, ২০:১৩

শিরোনাম
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রথম পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গ্যাস সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে মালয়েশিয়া: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সাড়ে ৭ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৭,৩৬৪ শিক্ষার্থীর, অর্ধেকের বেশি মোটরসাইকেলে :রোড সেফটি ফাউন্ডেশন আগামীকাল থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট মাদকবিরোধী লড়াইকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে: মির্জা ফখরুল জ্বালানি সংকট, ব্রিকস ও শুল্ক ইস্যুতে সরকারের অবস্থান জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রস্তুত ইসি, দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত নয় শাহজালাল বিমানবন্দরে অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সাময়িক স্থগিতাদেশ
শিরোনাম
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রথম পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গ্যাস সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে মালয়েশিয়া: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সাড়ে ৭ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৭,৩৬৪ শিক্ষার্থীর, অর্ধেকের বেশি মোটরসাইকেলে :রোড সেফটি ফাউন্ডেশন আগামীকাল থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট মাদকবিরোধী লড়াইকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে: মির্জা ফখরুল জ্বালানি সংকট, ব্রিকস ও শুল্ক ইস্যুতে সরকারের অবস্থান জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রস্তুত ইসি, দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত নয় শাহজালাল বিমানবন্দরে অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সাময়িক স্থগিতাদেশ

সনদ বাড়ছে, তবুও কেন কমছে না ধর্ষণ?

সনদ বাড়ছে, তবুও কেন কমছে না ধর্ষণ?

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

প্রকাশিত: ০৭ জুন, ২০২৬, ০০:০৮

একটি গাছে যদি কেবল ডালপালা বাড়ে, কিন্তু শেকড় শক্ত না হয়, তবে ঝড়ের দিনে সেটি সবচেয়ে আগে ভেঙে পড়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থাও যেন অনেকটা এমন। শিক্ষার ডালপালা বিস্তৃত হচ্ছে, সনদের সংখ্যা বাড়ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষিত মানুষের হারও বাড়ছে। কিন্তু মানুষের ভেতরের শেকড় নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ কতটা শক্ত হচ্ছে, সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। ফলে সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও মানুষের মতো মানুষ কি বাড়ছে?

প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণের খবর। কোনো দিন শিশু, কোনো দিন কিশোরী, কোনো দিন গৃহবধূ, আবার কোনো দিন বৃদ্ধা। যেন দেশের প্রতিটি সকাল নতুন কোনো নির্যাতনের সংবাদ নিয়ে হাজির হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই নিরক্ষর নয়। তারা স্কুল-কলেজে পড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে কিংবা উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী। অর্থাৎ তাদের হাতে বই ছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ ছিল, ডিগ্রিও ছিল। কিন্তু সেই শিক্ষা তাদের মানুষ বানাতে পারেনি। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য মাপা হয় জিপিএ, সিজিপিএ কিংবা চাকরির অবস্থান দিয়ে। কিন্তু সে কতটা মানবিক, কতটা নৈতিক কিংবা কতটা দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠছে, তা নিয়ে আলোচনা খুব কম হয়।

বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ পুরোপুরি কমে যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদেরও যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত থাকতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ে আলোচিত ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিযুক্তদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, করপোরেট কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। অর্থাৎ কেবল বিদ্যালয়ে যাওয়া বা ডিগ্রি অর্জন করা একজন মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিক করে তোলে না। এ বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, আমরা কি শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি কেবল সনদধারী মানুষ তৈরি করছি?

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পেছনে নানা সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক কারণ থাকলেও শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একটি বড় কারণ। আমাদের শিক্ষা মূলত গ্রন্থগত বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল। একজন শিক্ষার্থীকে শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হবে, কীভাবে চাকরির জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। কিন্তু অন্য একজন মানুষের মর্যাদা কী, নারীর প্রতি সম্মান কেন জরুরি, ক্ষমতার অপব্যবহার কতটা ভয়ংকর এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অনেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে তথ্য অর্জন করে, কিন্তু জ্ঞান অর্জন করে না। তথ্য মানুষকে দক্ষ করতে পারে, কিন্তু জ্ঞান মানুষকে বিবেকবান করে। যখন শিক্ষার ভেতর মানবিকতা অনুপস্থিত থাকে, তখন একজন ব্যক্তি ডিগ্রিধারী হলেও তার আচরণ অমানবিক হতে পারে। আরেকটি বড় কারণ হলো, পরিবার ও সমাজও শিক্ষার অর্থকে সংকুচিত করে ফেলেছে। সন্তান ভালো মানুষ হচ্ছে কি না, তার চেয়ে সে কত নম্বর পেয়েছে সেটিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে চরিত্র গঠনের চেয়ে সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতা বড় হয়ে দাঁড়ায়।

এই সংকট থেকে বের হতে হলে শিক্ষাকে কেবল চাকরি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বইয়ের অধ্যায়ের বাইরে বাস্তব জীবনের মূল্যবোধ শেখানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবারকে সন্তানের ফলাফলের পাশাপাশি তার আচরণ, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, নারীকে সম্মান করার শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও বিদ্যালয়ে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন মানুষ অপরাধী হয়ে জন্মায় না, তার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি সমাজ থেকেই গড়ে ওঠে। চতুর্থত, ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধের বিরুদ্ধে শক্ত সামাজিক বার্তা যায়।

ডিগ্রি কোনো মানুষের প্রকৃত পরিচয় নয়, তার আচরণই তার পরিচয়। আজ সমাজে ডিগ্রিধারীর অভাব নেই, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানীর অভাব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদি আমাদের শিক্ষা সত্যিকার অর্থে মানুষকে মানবিকতা শেখাত, তবে প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনামে ধর্ষণের খবর জায়গা পেত না। কারণ প্রকৃত জ্ঞান কখনো অন্যের মর্যাদা লঙ্ঘন করতে শেখায় না। শিক্ষার সাফল্যকে শুধু সনদের সংখ্যা দিয়ে নয়, সমাজে তৈরি হওয়া মানুষের মান দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। যে শিক্ষা একজন মানুষকে অন্য মানুষের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখায় না, সে শিক্ষা অসম্পূর্ণ। আর অসম্পূর্ণ শিক্ষা দিয়েই আমরা আজ এমন এক সমাজ গড়েছি, যেখানে ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু মানবতা অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে।

লেখক,

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

ইমেইলঃ [email protected]

আরও পড়ুন