০৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ২৩:৩২

শিরোনাম
কৃষিকে জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের পুরোনো দাম বহাল বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতের বাজেটে থাকছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : শিক্ষামন্ত্রী
শিরোনাম
কৃষিকে জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের পুরোনো দাম বহাল বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতের বাজেটে থাকছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : শিক্ষামন্ত্রী

বন্যা–জলবায়ু–দারিদ্র্য: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অদৃশ্য ত্রিভুজ

বন্যা–জলবায়ু–দারিদ্র্য: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অদৃশ্য ত্রিভুজ

কলাম লেখক

প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০০:২৩

বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে নীল রঙের আধিক্য চোখে পড়ে। নদীমাতৃক এই বদ্বীপের জন্মই হয়েছে পলি আর পানির মিতালীতে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই চিরচেনা পানিই যেন বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই সংবাদের শিরোনাম হয় ডুবে যাওয়া জনপদ, ভেসে যাওয়া ফসল আর গৃহহীন মানুষের হাহাকার। তবে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এটি কেবল ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বা নিছক ‘বন্যা’ নয়। এর পেছনে কাজ করছে তিনটি শক্তিশালী উপাদানের এক জটিল ও অদৃশ্য ত্রিভুজ বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দারিদ্র্য। এই ত্রিভুজটিই বর্তমানে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

ত্রিভুজের প্রথম বাহু: অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা ও তার ধরণ পরিবর্তন অতীতে বন্যা ছিল বাংলাদেশের কৃষির জন্য আশীর্বাদ। পলিমাটি জমিতে উর্বরতা বাড়াত। কিন্তু এখন বন্যার চরিত্র বদলে গেছে। অসময়ে বন্যা, ফ্লাশ ফ্লাড (হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা) এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা।

তীব্রতা বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়া এবং অতিবৃষ্টির কারণে নদীর ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

নদী ভরাট: অপরিকল্পিত বাঁধ, নদী শাসন এবং ড্রেজিংয়ের অভাবে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি উপচে লোকালয় প্লাবিত করছে।

ক্ষয়ক্ষতি: অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি এই বন্যা ভেঙে দিচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। রাস্তাঘাট, স্কুল এবং হাসপাতালগুলো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা উন্নয়ন বাজেটকে নতুন নির্মাণের বদলে মেরামতে ব্যয় করতে বাধ্য করছে।

ত্রিভুজের দ্বিতীয় বাহু: জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে খুব নগণ্য অবদান রাখলেও, এর ফলাফলের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। ঋতুচক্রের পরিবর্তন এখন দৃশ্যমান।

লবণাক্ততা বৃদ্ধি: উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। এতে কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে এবং সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে।

চরম আবহাওয়া: কখনো খরা, কখনো অতিবৃষ্টি। এই চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া কৃষকের শত বছরের লব্ধ জ্ঞানকে অকেজো করে দিচ্ছে। তারা বুঝতে পারছেন না কখন বীজ বুনবেন বা কখন ফসল তুলবেন।

ত্রিভুজের তৃতীয় বাহু: দারিদ্র্যের চক্রাকার ফাঁদ
বন্যা এবং জলবায়ুর আঘাত শেষ পর্যন্ত যেখানে গিয়ে আঘাত হানে, তা হলো মানুষের পকেট বা অর্থনীতি। এই ত্রিভুজের সবচেয়ে করুণ শিকার প্রান্তিক মানুষ।

সম্পদ হারানো: একজন কৃষক বা দিনমজুর হয়তো ঋণ করে ঘর তুলেছিলেন বা গবাদিপশু কিনেছিলেন। এক রাতেই বন্যায় তা ভেসে যায়। তিনি আবার শূন্য থেকে শুরু করেন, আবার ঋণ করেন। এই চক্র তাকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে দেয় না।

জলবায়ু উদ্বাস্তু: নদীভাঙন বা লোনা পানির কারণে ভিটেমাটি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে। এরা ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ (Climate Refugees)। শহরে এসে তারা সস্তা শ্রমে যুক্ত হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের জীবনমান উন্নয়ন হচ্ছে না।

অদৃশ্য সংযোগ ও উন্নয়নের ঝুঁকি
এই তিনটি বিষয়—বন্যা, জলবায়ু এবং দারিদ্র্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি ‘অদৃশ্য ত্রিভুজ’। জলবায়ু পরিবর্তন বন্যার তীব্রতা বাড়াচ্ছে, বন্যা মানুষকে নিঃস্ব করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, আর দারিদ্র্য মানুষকে বাধ্য করছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করতে এবং পরিবেশ ধ্বংস করতে (যেমন: গাছ কাটা বা নদী দখল)।

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয়, কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল কি ধরে রাখা সম্ভব হবে যদি প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ পানিতে ভেসে যায়? বিশ্বব্যাংকের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।

ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে আমাদের গতানুগতিক চিন্তার বাইরে আসতে হবে। শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ (Delta Plan 2100): এই মহাপরিকল্পনার সঠিক ও দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। নদী খনন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি: লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকদের মাঝে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। ভাসমান ধাপে চাষাবাদের মতো অভিযোজন কৌশল বাড়াতে হবে।

টেকসই বাঁধ ও অবকাঠামো: এমন রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ করতে হবে যা পানির তোড় সহ্য করতে পারে। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণে উচ্চতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

নগর পরিকল্পনা ও বিকেন্দ্রীকরণ: জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য জেলা শহরগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সবাই ঢাকামুখী না হয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতি: কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ড থেকে ক্ষতিপূরণ আদালে সোচ্চার হতে হবে।

বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি আমাদের সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করছে। ‘বন্যা–জলবায়ু–দারিদ্র্য’ এই ত্রিভুজটি ভেঙে দিতে না পারলে আমাদের উন্নয়নের স্বপ্নগুলো বারবার হোঁচট খাবে। এখনই সময় প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ না ভেবে, প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নিয়ে এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে একটি ‘স্মার্ট ও জলবায়ু-সহিষ্ণু’ বাংলাদেশ গড়ে তোলার।

লেখক,
হেনা শিকদার 
দর্শন বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 

আরও পড়ুন