একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় পরিবারের সব সুখ শান্তি
মালিয়া হক তন্দ্রা
প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল, ২০২৬, ০০:২৭
একটি মুহূর্ত একটি অসতর্কতা—আর তাতেই যেন থেমে যায় একটি পরিবারের হাসি, স্বপ্ন আর নিশ্চিন্ত দিনগুলোর গল্প। দুর্ঘটনা শুধু মানুষকে আহত করে না, এটি ছিনিয়ে নেয় একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন, কেড়ে নেয় তাদের শান্তি, ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের সমস্ত পরিকল্পনা। যে ঘর একসময় হাসির শব্দে ভরপুর ছিল, সেখানে আজ নীরবতা একটা শূন্যতা, যা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি একটি পরিবারের জীবনে চিরস্থায়ী দুঃখের ছাপ রেখে যায়। তেমনই ঈদের আনন্দকে বুকে নিয়ে, প্রিয়জনদের কাছে ফেরার তাড়নায় যখন মানুষ ছুটে চলে ঠিক সেই সময়ই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। বাড়ি ফেরার তাড়াহুড়ো, অতিরিক্ত যাত্রী আর অসতর্কতার মাশুল হিসেবে এক মুহূর্তেই লঞ্চডুবিতে নিভে যায় অসংখ্য স্বপ্নের আলো। যে যাত্রা ছিল আনন্দের, তা পরিণত হয় শোকের মিছিলে। মায়ের অপেক্ষা আর সন্তানের হাসি সবকিছু থেমে যায় নদীর বুকে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায়। ঈদের আগে যেখানে থাকার কথা ছিল উৎসবের আমেজ, সেখানে নেমে আসে কান্না আর হাহাকারের ছায়া। ঈদের আনন্দকে বুকে নিয়ে, প্রিয়জনদের কাছে ফেরার তাড়নায় যখন মানুষ ছুটে চলে ঠিক সেই সময়ই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। একটি অসতর্ক মুহূর্ত, আর তাতেই নিভে যায় একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, থেমে যায় হাসি আর ভালোবাসার গল্প।
১৮ মার্চ ২০২৬ ঈদের আনন্দকে ঘিরে যখন ঘরে ফেরার উচ্ছ্বাসে মুখর ছিল সারা দেশ, ঠিক সেই দিনই ঘটে যায় দুটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। একদিকে ট্রেন দুর্ঘটনা, অন্যদিকে লঞ্চ দুর্ঘটনা দুই ঘটনাই মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষের জীবনকে শোকের অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়। দিনের শুরুতেই বগুড়ার সান্তাহার এলাকায় ঘটে ভয়াবহ একটি ট্রেন দুর্ঘটনা। ঢাকা থেকে চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি হঠাৎ করেই লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। স্টেশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দে ঘটে এই দুর্ঘটনা, যা মুহূর্তেই যাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় আতঙ্ক।
ঈদের ভিড়ে ট্রেনটি ছিল উপচে পড়া ভেতরে জায়গা না পেয়ে অনেকেই ছাদে বসে যাত্রা করছিলেন। লাইনচ্যুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক যাত্রী ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে কান্না, আর্তনাদ আর বিশৃঙ্খলা একটি আনন্দমুখর যাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয় আতঙ্ক ও শোকে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, একই দিনে বিকেলে রাজধানীর সদরঘাটে ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ১৪ নম্বর পন্টুনের কাছে ‘আসা যাওয়া-৫’ নামের একটি লঞ্চ যাত্রী তুলছিল। ঠিক সেই সময় ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ নামের আরেকটি লঞ্চ এসে ধাক্কা দিলে ভয়াবহ সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী মো. সোহেল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার শ্বশুর মিরাজ ফকির এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং শাশুড়ি রুবা ফকির গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা নিখোঁজদের সন্ধানে নদীতে নামেন, তবে রাত হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরদিন সকালে পুনরায় অনুসন্ধান চালানোর কথা জানানো হয়েছে।
একই দিনে ঘটে যাওয়া এই দুই দুর্ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় অসতর্কতা, অব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তাহীনতা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ঈদের আনন্দে ঘরে ফেরার পথে যারা স্বপ্ন বুনছিলেন, তাদের অনেকের সেই স্বপ্ন চিরতরে থেমে গেছে।
এরপর ২৫ মার্চ ২০২৬, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঘটে আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা, যা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। বিকেলে ৩ নম্বর পন্টুনে ফেরিতে ওঠার সময়,`সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ২৬ জন প্রাণ হারান। বাসটি প্রায় ৩০ ফুট গভীরে তলিয়ে যায় এবং উদ্ধারকারী দল পানি থেকে বাসটি টেনে তোলে। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্রেক ফেল বা চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
পরদিন ২৬ মার্চ ২০২৬, চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট এলাকায় ঘটে ভয়াবহ এক ট্রেন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগিতে হঠাৎ আগুন ধরে যায়, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত যাত্রীরা দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে নিরাপদ স্থানে সরে যান। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ট্রেনে প্রায় ৬০০ যাত্রী থাকলেও সৌভাগ্যবশত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। একই দিনে রাঙামাটির নানিয়ারচর থেকে চট্টগ্রামগামী একটি যাত্রীবাহী বাস সাপছড়ি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে উল্টে যায়। ঢালু সড়কে বাসটি পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে উল্টে পড়ে, এতে অন্তত ১৯ জন যাত্রী আহত হন। বাসটিতে প্রায় ৫০ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের বেশিরভাগই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা পোশাক শ্রমিক। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন এবং আহতদের রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে পাঠান। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, অন্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যান। তবে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে, যা দায়িত্বহীনতার একটি উদ্বেগজনক দিক নির্দেশ করে।
এই ধারাবাহিক দুর্ঘটনাগুলো আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে অব্যবস্থাপনা, অসতর্কতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে কত সহজেই নিভে যেতে পারে অসংখ্য প্রাণ। ঈদের আনন্দে ঘরে ফেরার পথে যারা স্বপ্ন বুনছিলেন, তাদের অনেকের সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। এই শোক শুধু কিছু পরিবারের নয়, এটি পুরো জাতির। এখন সময় কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার, দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর যাতে আর কোনো পরিবারের সুখ-শান্তি এভাবে মুহূর্তেই ভেঙে না যায়।
লেখক,
মালিয়া হক তন্দ্রা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ইমেইল : [email protected]
আরও পড়ুন
- • হামের উপসর্গে ১৫ দিনের ব্যবধানে যমজ দুই শিশুর মৃত্যু
- • শুক্রবার থেকে বাড়বে বৃষ্টি, কমবে তাপপ্রবাহ
- • কৃষিকে জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- • ঝিনাইদহে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, গণপিটুনিতে ধর্ষক নিহত
- • ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে দুই বাংলাদেশি আহত
- • ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের পুরোনো দাম বহাল
- • চেলসি কিংবদন্তি ববি ট্যাম্বলিংয় আর নেই
- • বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন
- • ফ্রিল্যান্সারদের আয়ে থাকছে না সাড়ে সাত শতাংশ কর
- • ফ্লোরিডা নয়, ডোবার পাশেই মিলবে মশা দমনের শিক্ষা: প্রধানমন্ত্রী
- • বৈশ্বিক অস্থিরতায় স্বর্ণের দামে নতুন প্রভাব
- • জানা গেলো মৃত নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক কন্যার পরিচয়
- • পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
- • নতুন গানে পরীমণি
- • প্রশাসনে বড় রদবদল, সাত অতিরিক্ত সচিবকে নতুন দায়িত্ব
- • ৫ দিনের বৃষ্টির খবর দিল আবহাওয়া অফিস
- • বুধবার বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করবে বিইআরসি
- • তাপমাত্রা পৌঁছাতে পারে ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি
