০৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ২৩:২৯

শিরোনাম
কৃষিকে জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের পুরোনো দাম বহাল বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতের বাজেটে থাকছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : শিক্ষামন্ত্রী
শিরোনাম
কৃষিকে জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের পুরোনো দাম বহাল বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতের বাজেটে থাকছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : শিক্ষামন্ত্রী

হযরত মুহাম্মদ সা. জীবন ও রমজানের গুরুত্ব

হযরত মুহাম্মদ সা. জীবন ও রমজানের গুরুত্ব

প্রতিফলন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০০:৫২

মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।(সুরা আল-বাকারা: ১৮৩)

এই আয়াতের মধ্যে লুকিয়ে আছে রমজানের প্রকৃত দর্শন। রোজা কেবল ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়। এটি আসলে নৈতিক ও আত্মিক চর্চার এক ব্যাপক প্রশিক্ষণ। রমজান মাস একজন মুমিনকে প্রস্তুত করে জীবনের বৃহত্তর পরীক্ষার জন্য। এখানে ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করা শুধু শারীরিক একটি কাজ নয়, এটি মনকে শক্তিশালী করার, ইচ্ছাশক্তিকে দৃঢ় করার এবং প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার এক অনন্য মাধ্যম।
 
রাসুলুল্লাহ সা. রমজান মাসকে কীভাবে কাটাতেন, তা আমাদের জন্য এক অনুপম আদর্শ। তিনি এই মাসে দান-সদকা, নেক কাজ এবং কোরআন তিলাওয়াত বহুগুণ বৃদ্ধি করতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. সবসময়ই দানশীল ছিলেন, কিন্তু রমজান মাসে তাঁর দানশীলতা ছিল প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি। (বুখারি ও মুসলিম)
 
নবীজি সা. আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসে রোজা রাখবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে। (বুখারি ও মুসলিম) এই হাদিসের বাণী আমাদের হৃদয়ে এক গভীর আশার সঞ্চার করে। যত পাপই আমরা করে থাকি না কেন, রমজান আমাদের জন্য নিয়ে আসে নতুন করে শুরু করার সুযোগ। মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার এই মাসে প্রতিটি নেক কাজ আমাদের আত্মাকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এটি এমন এক সময়, যখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়, যাতে মানুষ নিজের বিবেকের আওয়াজ স্পষ্টভাবে শুনতে পারে।
 
রমজানের আরেকটি অসাধারণ মহিমান্বিত বিষয় হলো লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। কোরআনে আল্লাহ তা’আলা এই রাত সম্পর্কে বলেছেন, শবে কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সুরা আল-কদর: ৩)
 
চিন্তা করে দেখুন,একটি মাত্র রাত, যা হাজার মাসের, অর্থাৎ প্রায় তিরাশি বছরের চেয়েও বেশি মূল্যবান! এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতরণ করেন। এই রাতেই নাজিল হয়েছিল পবিত্র কোরআন। এই রাতে আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের দোয়া কবুল করেন এবং তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করেন আগামী বছরের জন্য।
 
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় শবে কদরে দাঁড়িয়ে ইবাদত করবে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।(বুখারি ও মুসলিম) এই রাত আমাদের আত্মসমালোচনার, অন্তরের গভীর থেকে দোয়া করার এবং নেক কাজের মাধ্যমে আল্লাহর অসীম রহমত প্রাপ্তির এক অনন্য সুযোগ দেয়। রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে এই মহিমান্বিত রজনীকে খোঁজার জন্য নবীজি সা. ইতিকাফে বসতেন এবং সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন।  হযরত আয়েশা (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! যদি আমি শবে কদর পাই, তাহলে কী দোয়া করব? নবীজি সা. বললেন, বলবে,আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউ্ন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি (হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন)।
 
রমজান কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাস নয়। এটি আমাদের সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিক মূল্যবোধও স্মরণ করিয়ে দেয়। এই মাসে যাকাত, ফিতরা ও দান-সদকার মাধ্যমে আমরা সমাজের দুর্বল, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াই। একজন রোজাদার যখন সারাদিন না খেয়ে থাকেন, তখন তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন যে, যারা সারা বছর অভুক্ত থাকেন, তাদের কষ্ট কতটা তীব্র। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত একটি, যা রমজান মাসে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে যাতে গরিবরাও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। 

নবীজি সা. বলেছেন, সদকা (দান) মানুষের পাপকে এমনভাবে নিভিয়ে দেয় যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়। (তিরমিজি) এই দান-সদকা শুধু গ্রহীতার উপকার করে না, বরং দানকারীর হৃদয়ে মানবিকতা, নম্রতা ও কৃতজ্ঞতাবোধও জাগ্রত করে। যখন একজন সচ্ছল মানুষ তার সম্পদ থেকে কিছু অংশ দরিদ্রকে দান করেন, তখন তার মধ্যে স্বার্থপরতা কমে যায় এবং সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়। এটি সমাজে ধনী-গরিবের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে এক সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করে।
 
রমজান মাসের আরেকটি বিশেষত্ব হলো, এই মাসেই নাজিল হয়েছিল পবিত্র কোরআন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী হিসেবে। (সুরা আল-বাকারা: ১৮৫) কোরআন শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য জীবনবিধান। এতে রয়েছে আইন-কানুন, নৈতিকতা, সামাজিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং আধ্যাত্মিক পথনির্দেশনা। রমজান মাসে কোরআন তিলাওয়াত, বুঝে পড়া এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবীজি সা. প্রতি রমজানে হযরত জিবরাইল (আ.) এর সাথে কোরআন দাওর (পুনরায় পাঠ) করতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর দুইবার দাওর করেন। এটি প্রমাণ করে যে, রমজান ও কোরআন একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রোজা যেমন শরীরকে পবিত্র করে, কোরআন তেমনি হৃদয় ও মনকে আলোকিত করে।
 
রমজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো আত্মসংযম বা self-discipline। একজন রোজাদার সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকেন, কিন্তু এর পাশাপাশি তাকে বিরত থাকতে হয় মিথ্যা বলা, গীবত করা, ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীল কথাবার্তা এবং যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকেও। নবীজি সা. বলেছেন,যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল করা ছাড়ল না, তার এই পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।(বুখারি) এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, রোজার প্রকৃত মূল্য শুধু খালি পেটে থাকায় নয়, বরং চরিত্র ও আচরণের পরিশুদ্ধিতে। রোজা মানুষকে শেখায় নিজের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। যে মানুষ একমাস নিয়মিত রোজা রাখে, সে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণে।
 
ধৈর্য বা সবরও রমজানের আরেকটি বড় শিক্ষা। পিপাসা, ক্ষুধা এবং শারীরিক কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে একজন মুমিন শক্তিশালী হয়ে ওঠেন মানসিকভাবে। এই ধৈর্যের অনুশীলন তাকে জীবনের অন্যান্য কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহসী ও দৃঢ়চিত্ত করে তোলে।
 
দুঃখজনকভাবে বর্তমান সমাজে রমজান মাসেও নানা ধরনের অসংগতি দেখা যায়। যেখানে এই মাসটি হওয়ার কথা সংযম ও ত্যাগের, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ভোগবিলাসিতা ও অপচয়ের প্রবণতা। ইফতারের নামে অতিরিক্ত খাবারের আয়োজন, মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেওয়া, রাত জেগে অনর্থক সময় কাটানো,এসব রমজানের মূল চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।


 

আরও পড়ুন