০৫ জুন ২০২৬, শুক্রবার, ০৩:২০

শিরোনাম
পদোন্নতিতে বৈষম্যের অভিযোগে অবসরে যাচ্ছেন সিআইডি প্রধান কৃষিকে জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের পুরোনো দাম বহাল বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার
শিরোনাম
পদোন্নতিতে বৈষম্যের অভিযোগে অবসরে যাচ্ছেন সিআইডি প্রধান কৃষিকে জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের পুরোনো দাম বহাল বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেপ্তার ২ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি তিন জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিল সরকার

‎অপরাধের উল্লাস, ন্যায়ের নীরবতা: ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার বাস্তব কারণ

‎অপরাধের উল্লাস, ন্যায়ের নীরবতা: ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার বাস্তব কারণ

কলাম লেখক

প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০১:২৪

‎প্রতিদিন সংবাদ খুললে বা সামাজিক মাধ্যমে চোখ রাখলে একটি খবর প্রায়শই আমাদের চোখে পড়ে ধর্ষণের খবর। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা কেউই এই পাশবিকতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ধর্ষণ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সমাজের নারীদের ফেলে দিচ্ছে নিরাপত্তাহীনতার মুখে। এই বর্বরতার বিস্তার ঠেকাতে সরকার আইন কঠোর করেছে, এমনকি ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও নির্ধারণ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এত কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কেন ধর্ষণের ঘটনা কমছে না? কেন অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে আমাদের সমাজ, আইনব্যবস্থা ও নৈতিক কাঠামোর গভীরে তাকাতে হবে।

‎নৈতিক অবক্ষয় ও বিকৃত মানসিকতা ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আজকের সমাজে অশ্লীলতা, পর্নোগ্রাফি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন কনটেন্টের সহজলভ্যতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের বিকৃত চিন্তাভাবনা তৈরি করছে। নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার মানসিকতা বাড়ছে। এর ফলেই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে চলেছে। ‎এছাড়াও পারিবারিক শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। পরিবারে সন্তানদের মানবিকতা, সংযম ও নারী-পুরুষ সমতার শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি থেকে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম নারীকে সম্মান করতে শেখে না। নৈতিকতার এই দুর্বলতা সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ায়। ‎ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ঘটনার পর সমাজের একটি বড় অংশ নীরব থাকে। কেউ প্রতিবাদ করে না, বরং ঘটনাটি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই নীরবতা অপরাধীদের সাহস বাড়ায় এবং ভুক্তভোগীরা আরও একা হয়ে যায়।‎ক্ষমতাবানদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ও ধর্ষণ বাড়ার অন্যতম কারণ। অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য। ফলে তারা আইনকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করে বেঁচে যায়। এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি সাধারণ অপরাধীদেরও সাহসী করে তোলে। ‎বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাও একটি বড় কারণ। মানুষ জানে, বিচার পেতে বছর কেটে যায়, প্রমাণ নষ্ট হয়, সাক্ষী পাওয়া যায় না, শেষে হয়তো অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাবে। ফলে অনেক ধর্ষণের শিকার নারীই অভিযোগ করেন না। এই ভয় ও অবিশ্বাসই অপরাধকে বাড়িয়ে দেয়।

‎ধর্ষণ এখন শুধুই আইনগত অপরাধ নয় বরং সমাজের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে, কিন্তু শাস্তির ভয় না থাকায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হচ্ছে। ‎বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে ‎“Certainty of punishment is more important for deterring crime than the severity of punishment.” ‎অর্থাৎ শাস্তি কত ভয়াবহ তা নয়, বরং অপরাধী নিশ্চিতভাবে শাস্তি পাবে এই নিশ্চয়তাই অপরাধ দমনে সবচেয়ে কার্যকর। ‎কিন্তু বাংলাদেশে এই নিশ্চয়তাই অনুপস্থিত। ধর্ষণের মামলা হয়, কিন্তু বিচার পর্যন্ত পৌঁছায় খুব কম। বিচারহীনতা, দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রমাণের ঘাটতি অপরাধীদের আরও নির্ভীক করে তুলছে। তারা জানে, বিচার হবে না বা হলেও তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে। ‎বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে বিচারকের সংখ্যা মাত্র দুই হাজারের কিছু বেশি। বিচারকের এই অপ্রতুলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিচার বিলম্বের অন্যতম কারণ। বছর পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, প্রমাণ হারিয়ে যায়, অপরাধীরা সহজে মুক্তি পেয়ে যায়। ‎এছাড়া দেশে এখনো কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা আইন নেই। সাক্ষীরা নিরাপত্তার অভাবে আদালতে যেতে ভয় পান। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হারিয়ে যায়, মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়। প্রভাবশালী অপরাধীরা সহজেই আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বেঁচে যায়। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজের দলের সদস্য বা সমর্থককে রক্ষায় চাপ সৃষ্টি করেন। এতে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয় এবং অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যায়। ‎ধর্ষণের পরও ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয় -“সে কী ধরনের পোশাক পরেছিল?”, “কেন রাতে বের হয়েছিল?” এই মনোভাব ভুক্তভোগীদের আরও মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। তারা অনেক সময় ন্যায়বিচার চাওয়ার সাহস হারায়। এই “ভিক্টিম-ব্লেমিং সংস্কৃতি” অপরাধীদের পক্ষে কাজ করে। ‎তাছাড়া দেশের অধিকাংশ থানায় এখনো পর্যাপ্ত ডিএনএ টেস্টের সুবিধা ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে। তদন্তের সময় গাফিলতি ও প্রমাণ নষ্ট হওয়ার কারণে অনেক মামলা আদালতে টেকে না। ফলে অপরাধীরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়।

‎‎ধর্ষণ রোধে কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক পুনর্জাগরণ।যতদিন পর্যন্ত “বিচারহীনতার সংস্কৃতি” ভাঙা না যাবে, ততদিন পর্যন্ত কোনো আইনই ধর্ষণ বন্ধ করতে পারবে না। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। ‎আইন যদি কাগজে থাকে কিন্তু তার প্রয়োগ না হয়, তবে সেই আইন সমাজে ন্যায়ের নিশ্চয়তা দেয় না; বরং অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে। নারীর প্রতি সম্মান, ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এই তিনটির সমন্বয়ই পারে আমাদের সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে।

‎বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেমন নরওয়ে, কানাডা, জাপান বা নিউজিল্যান্ডে অপরাধ কমার প্রধান কারণ সেখানে আইন প্রয়োগের নিশ্চয়তা ও দ্রুত বিচারব্যবস্থা। অপরাধীর সামাজিক মর্যাদা, অর্থ বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের শাসন সমানভাবে কার্যকর। ‎বাংলাদেশেও যদি সেই ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে সমাজ থেকে ধর্ষণ কমে আসবে, নারী ফিরে পাবে নিরাপত্তা ও মর্যাদা।

লেখক, 
‎আজিজুন ইয়াসরিন বুশরা 
‎শিক্ষার্থী,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
 

আরও পড়ুন