০৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৮:৪৩

শিরোনাম
৭ জুন থেকে মেট্রোরেলের শেষ ট্রেনে বাড়লো ২০ মিনিট জুলাই প্রতিবেদন নিয়ে আওয়ামী লীগের আপত্তি খারিজ করল জাতিসংঘ পঞ্চমবারের মতো সাফের সভাপতি হচ্ছেন কাজী সালাউদ্দিন মায়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পদ হারালেন যুগ্মসচিব প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফর ঘিরে প্রস্তুতি, থাকছে যেসব কর্মসূচি ১৪ জুন কক্সবাজারে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রিপেইড মিটারে স্বস্তি, বাতিল মাসিক চার্জ দেশে ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১,২৬৫
শিরোনাম
৭ জুন থেকে মেট্রোরেলের শেষ ট্রেনে বাড়লো ২০ মিনিট জুলাই প্রতিবেদন নিয়ে আওয়ামী লীগের আপত্তি খারিজ করল জাতিসংঘ পঞ্চমবারের মতো সাফের সভাপতি হচ্ছেন কাজী সালাউদ্দিন মায়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পদ হারালেন যুগ্মসচিব প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফর ঘিরে প্রস্তুতি, থাকছে যেসব কর্মসূচি ১৪ জুন কক্সবাজারে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রিপেইড মিটারে স্বস্তি, বাতিল মাসিক চার্জ দেশে ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১,২৬৫

ব্যাংকিং খাত: বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ব্যাংকিং খাত: বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

কলাম লেখক

প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০০:২৫

ব্যাংকিং খাত একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অর্থের প্রবাহ সচল রাখা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা অপরিহার্য। আধুনিক যুগে ব্যাংকিং আর শুধু আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি, বৈশ্বিক সংযোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের এক বিস্তৃত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। তবে এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি খাতটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঐতিহাসিক শেকড় বহু পুরোনো হলেও আধুনিক ব্যাংকিং কাঠামোর বিকাশ ঘটে শিল্প বিপ্লবের পর। বাজার অর্থনীতি বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মূলধন সঞ্চালন, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা দ্রুত বাড়ে। ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে, ঋণ প্রদান করে ব্যবসা ও শিল্পকে এগিয়ে নেয়, অর্থ স্থানান্তর সহজ করে এবং একটি দেশের মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশক থেকে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠিত ও সম্প্রসারিত হতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও নীতিনির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি চালিকাশক্তি। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাংকগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি বিশেষায়িত ব্যাংক, মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান এবং সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল ব্যাংকিং কাঠামোও গড়ে উঠছে। ব্যাংকিং সেবার পরিধি এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত, ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার ব্যাংকিং খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ই-ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহকরা দ্রুত ও সহজে আর্থিক সেবা পাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে বিকাশ, নগদ এবং রকেট দেশের মোবাইল ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

তবে ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত বর্তমানে কয়েকটি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন। এর মধ্যে অন্যতম হলো অসচ্ছল ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল)। যখন ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা ব্যাংকের জন্য আর্থিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এর ফলে ব্যাংকের আয় কমে যায়, মূলধন ঘাটতি দেখা দেয় এবং নতুন ঋণ প্রদানে সংকোচ তৈরি হয়। একই সঙ্গে অনিয়ম, দুর্নীতি ও তদারকির দুর্বলতা ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনসাধারণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও স্বচ্ছ প্রশাসন ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন। ডিজিটাল অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত ঝুঁকি। সাইবার হামলা, তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিক প্রযুক্তি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী জনবল তৈরি না হলে ব্যাংকিং খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। 
আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাংকিং খাত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের উত্থান, অ্যাপভিত্তিক আর্থিক সেবা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ব্যাংকিংকে আরও গতিশীল করেছে। ঝুঁকি বিশ্লেষণ, গ্রাহক আচরণ মূল্যায়ন ও ঋণ অনুমোদনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ব্লকচেইন প্রযুক্তি লেনদেনে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যদিও বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি এখনো কঠোর নিয়ন্ত্রিত পরিসরে রয়েছে।

ভবিষ্যতের ব্যাংকিং হবে প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশ-সচেতন। গ্রিন ব্যাংকিং ধারণার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন বৈশ্বিক প্রবণতা। একই সঙ্গে নারীরা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও সঞ্চয় সুবিধা নিশ্চিত করাও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বাংলাদেশ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল রাখতে নীতিগত সহায়তা প্রদান করছে। ব্যাংকিং আইন আধুনিকীকরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার, এনপিএল হ্রাসে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো উন্নয়ন এসব উদ্যোগের অংশ। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দক্ষ ব্যাংকার তৈরির প্রচেষ্টাও চলছে। গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। ডিজিটাল লেনদেনে নিরাপত্তা বজায় রাখা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, ওটিপি গোপন রাখা এবং সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত ঋণ গ্রহণের আগে সুদের হার, পরিশোধ সময়সূচি ও শর্তাবলি ভালোভাবে বোঝা উচিত।

সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের এক সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। সুশাসন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ ও শক্তিশালী নীতিনির্ধারণ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত্তিও সুদৃঢ় করতে পারবে।

লেখক, 
লুৎফুন্নাহার,
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা

আরও পড়ুন