খাদ্য নিরাপত্তা, ডলার রাজনীতি ও বাংলাদেশের সংকট
লাবনী আক্তার শিমলা
প্রকাশিত: ২৩ মে, ২০২৬, ০০:৫৯
একুশ শতকের যুদ্ধ আজ আর শুধু কামান, অস্ত্র, মিসাইল অথবা ড্রোন হামলায় সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে এখন অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র হলো খাদ্য, ডলার এবং জ্বালানি। বিশেষ করে ২০২৪ এর পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় আমরা দেখেছি, সামরিক শক্তির চেয়েও জীবনদায়ী পণ্যের নিয়ন্ত্রণ কোনো দেশের ওপর মারাত্মক সংকট ও প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের পর থেকে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন যেভাবে ভেঙে পড়েছিল, তার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এই প্রেক্ষাপটেই, বাংলাদেশের মতো জনবহুল একটি দেশের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল কৃষির বিষয় নয়, বরং এটি একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক শৃঙ্খল।
রাশিয়া বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম গম রপ্তানিকারক এবং সার উৎপাদনের কেন্দ্র।আর এই খাদ্যকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেই রাশিয়া বহু নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অন্যান্য দেশের সাথে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে। যদিও রাশিয়া কখনোই একে অস্ত্র হিসেবে আখ্যা দেয় না বরং একে কৌশলগত সহায়তা নাম দিয়েছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ববাজারের গমের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং পটাশ সারের প্রায় ৩০ শতাংশে রাশিয়া সরবরাহ করে থাকে।বাংলাদেশ ধানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও তার গমের চাহিদার একটি বিশাল অংশের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। বাংলাদেশ তার গমের চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আমদানি করে রাশিয়া ও কানাডা থেকে । পূর্বে ভারত থেকে প্রধানত আমদানি করা হলেও ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ইউক্রেন সংকটের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার প্রধান ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম SWIFT নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যখন পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন বাংলাদেশ এক কঠিন দোটানায় পড়ে। একদিকে খাদ্যশস্যের প্রয়োজনীয়তা, অপরদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া বাংলাদেশকে বিকল্প লেনদেনের প্রস্তাব দেয়। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব ও বৈশ্বিক রাজনীতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
তবে চীনের তৈরি বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা CIPS (Cross-Border Interbank Payment System) ব্যবহার করলেও বাংলাদেশের ডলারনির্ভরতা পুরোপুরি কাটেনি। কারণ, CIPS-এর মাধ্যমেও অনেক লেনদেন পরোক্ষভাবে ডলারের ওপর ভিত্তি করে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ যদি রাশিয়া ও চীনের মধ্যে প্রচলিত রুবল-ইউয়ান লেনদেনের পথ বেছে নেয় এবং সতর্কতার সাথে CIPS-এর আওতায় রাশিয়াকে অর্থ পরিশোধ করতে পারে, তাহলে SWIFT নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব। এটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাজনিত আর্থিক চাপ থেকে অনেকটা নিরাপত্তা দিতে পারে।
শুধু রুবল বা ইউয়ান লেনদেন নয়, আরও কার্যকর সমাধান হতে পারে বার্টার ট্রেড বা সরাসরি পণ্য বিনিময় চুক্তি। অর্থাৎ, নগদ ডলার বা অন্য মুদ্রার বদলে বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছে পণ্য রপ্তানি করবে এবং বিনিময়ে গম বা সার আমদানি করবে। উদাহরণস্বরূপ, পাট, পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, ওষুধ ইত্যাদি রপ্তানিতে বাংলাদেশ বারটার ট্রেডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। ইতিমধ্যেই রাশিয়া বেশ কয়েকটি দেশের সাথে বার্টার ট্রেড চুক্তি করলেও বাংলাদেশ এখনো এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি করতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক বৈঠকে রাশিয়ান কর্মকর্তারা পাট ও পোশাক খাতে আগ্রহ দেখিয়েছেন, যা সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে।
বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিভুজ সম্পর্কের মাঝে রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা অনেকটাই একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার মতো। কারণ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরে আসতে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এই কারণে রাশিয়ার পণ্যবাহী জাহাজ ভারতের হলদিয়া বা অন্য কোনো বন্দরে খালাস করে ছোট জাহাজে বাংলাদেশে আনতে হয়েছে। এতে পরিবহন খরচ বেড়েছে অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মতো, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতির আকারে।এছাড়া, বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপরও এই প্রভাব বর্তায়। দেশের ধান উৎপাদনের জন্য প্রচুর পটাশ ও ইউরিয়া সার প্রয়োজন। অথচ, রাশিয়ার বেলারুশ-রাশিয়াকেন্দ্রিক পটাশ সরবরাহ ব্যবস্থা বিশ্বের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২৬ সালে এসেও, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া থেকে সার না এলে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে।
একুশ শতকের একটি জটিল সংকট হলো ডলারের তারল্য সংকট। বাংলাদেশ যখন ডলার সাশ্রয় করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন রাশিয়া তার পণ্য বিক্রির বিনিময়ে রুবল বা ইউয়ান ব্যবহারের প্রস্তাব দিচ্ছে। কিন্তু যদি এই কাজ করা হয়, তবে বাংলাদেশ তার নিজস্ব রিজার্ভ থেকে মূল্যবান মার্কিন ডলার বাঁচাতে পারবে ঠিকই, কিন্তু এর মাধ্যমে ডলার আসার পথ সঙ্কুচিত হয়ে আসবে। একইসাথে এতে অতিরিক্ত মুদ্রা রূপান্তর ব্যয়, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা বাংলাদেশকে একটি বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করবে। কারণ এতে ডলার থেকে রুবল বা ইউয়ানে রূপান্তরে অতিরিক্ত খরচ বেড়ে যাবে।এছাড়া এতে বৈশ্বিক নিয়মনীতি ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিধিনিষেধের জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। এভাবে ভূ-রাজনীতি প্রভাব খাদ্য নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তোলে। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশ নিরপেক্ষ ও বাস্তববাদী অবস্থানে থেকে এই দ্বিধা সমাধান করতে পারে। এটাকে অনেকেই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন আখ্যা দিয়েছেন- যেখানে একটি দেশ তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করে সবার সাথেই ভারসাম্য বজায় রেখে চলে।
এই খাদ্য নিরাপত্তা কেবল ঢাকা বা মস্কোতে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ শুধু রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞাই নয়, বৈশ্বিক সামুদ্রিক রুটের অস্থিতিশীলতাও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সুয়েজ খাল এবং লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতা কিংবা কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেন-রাশিয়া নৌ-সংঘাত গমের কার্গো চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। সংঘাত এড়াতে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ (যেমন আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে) পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা যাতায়াত সময় ও জ্বালানি খরচ অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি, জাহাজের বিমা খরচও বেড়েছে। এই বাড়তি খরচ রাশিয়ার কোনো কোম্পানি বহন করে না, বরং আমদানিকারক হিসেবে বাংলাদেশকে বহন করতে হয়। ফলে রাশিয়ার গম সস্তা হলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা অনেক ব্যয়বহুল খাদ্যে পরিণত হয়েছে।
রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে। এজন্য বাংলাদেশ এখন ভারত, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য চুক্তির চেষ্টা করছে। যদিও এই জটিল সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। তবুও, শুধু চুক্তির পেছনে না ছুটে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায়। প্রথমত, খাদ্য নিরাপত্তাকে কেবল আমদানিনির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ গুদামজাত ক্ষমতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার সাথে লেনদেনের জন্য ব্রিক্স বা অন্য কোনো জোটের অধীনে একটি স্থায়ী বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, রাশিয়া থেকে কেবল সার না কিনে, বাংলাদেশে রাশিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সার কারখানা স্থাপনের যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। এতে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তাও সৃষ্টি হবে। চতুর্থত, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের উচিত একক কোনো রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমুখী আমদানি উৎস গড়ে তোলা। পঞ্চমত, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও সহজলভ্যতা আরও বাড়াতে হবে। এতে পূর্বাভাসজনিত তথ্য, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মনিটরিং করা, সেচ ব্যবস্থা উৎপাদন বৃদ্ধি করবে ও ক্ষতি কমে আসবে। ষষ্ঠত, গবেষণার মাধ্যমে গমের আরও উন্নত জাত বিশেষ করে খরা সহনশীল জাত আবিষ্কার করতে হবে। শুধু গম নিয়ে কাজ নয়, পুরো কৃষি ব্যবস্থাকে আরও বেশি উন্নত ও আধুনিক করতে এগিয়ে আসতে হবে।
ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে যখন খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চাপে পড়ছে, তখন বাংলাদেশকে হতে হবে আরও কৌশলী ও দূরদর্শী। এখনই সময় বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ, ভবিষ্যতের বিশ্বে খাদ্য, জ্বালানি ও ডলারের নিয়ন্ত্রণই নির্ধারণ করবে কোন রাষ্ট্র কতটা স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে পারবে। তাই কৃষি উন্নয়ন, রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াসই হতে পারে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
লেখক,
লাবনী আক্তার শিমলা
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
আরও পড়ুন
- • ফোর্বসের ‘৩০ আন্ডার ৩০ এশিয়া’ তালিকায় জায়গা পেলেন হানিয়া আমির
- • ধর্মেন্দ্রর বায়োপিকে কে? জবাব দিলেন ববি
- • মেধা হারাচ্ছে দেশ
- • মাদকের ছোবলে হারিয়ে যাচ্ছে তরুন সমাজ
- • আবারো বাড়ল দেশের রিজার্ভ
- • আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু, মিলল তদন্তের প্রতিবেদন
- • কুয়েতে ড্রোন হামলায় আহত ৪ বাংলাদেশি
- • ৫ দিনের বৃষ্টির খবর দিল আবহাওয়া অফিস
- • ফ্রিল্যান্সারদের আয়ে থাকছে না সাড়ে সাত শতাংশ কর
- • ফ্লোরিডা নয়, ডোবার পাশেই মিলবে মশা দমনের শিক্ষা: প্রধানমন্ত্রী
- • বৈশ্বিক অস্থিরতায় স্বর্ণের দামে নতুন প্রভাব
- • পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
- • ত্যাগের মহিমায় উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা
- • জানা গেলো মৃত নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক কন্যার পরিচয়
- • নতুন গানে পরীমণি
- • কোকোর কবর জিয়ারত করলেন তারেক রহমান
- • লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে হিজবুল্লাহর দফায় দফায় পাল্টা হামলা
- • প্রশাসনে বড় রদবদল, সাত অতিরিক্ত সচিবকে নতুন দায়িত্ব
